আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কাটা অগ্রিম কর ফেরত পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে শহর এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের নামজারি ও বণ্টনের ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
সঞ্চয়পত্রের কর ফেরত পেতে রিটার্ন বাধ্যতামূলক:
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে না। বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে প্রকৃত কর দায় নির্ধারণ করা হবে। যদি কাটা করের পরিমাণ প্রকৃত করের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
তবে এই অর্থ ফেরত পেতে করদাতাকে অবশ্যই রিটার্ন দাখিল করতে হবে। যাঁদের করযোগ্য আয় নেই কিন্তু সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ রয়েছে, তাঁদেরও কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিয়ে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে। রিটার্নের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ করে কর ফেরতের আবেদন করতে হবে। যাচাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে।
এত দিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কাটা কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে নিয়মিত রিটার্ন দাখিলকারী অনেক বিনিয়োগকারী নতুন ব্যবস্থায় সুবিধা পাবেন।
জমি ও ফ্ল্যাটের নামজারিতে রিটার্নের শর্ত:
প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জমি ও ফ্ল্যাটের বণ্টন কিংবা নামজারি করতে হলে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। প্রমাণপত্র ছাড়া এসব কাজ সম্পন্ন করা যাবে না।
বর্তমানে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি, লিজ, হস্তান্তর কিংবা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে মালিকানা হস্তান্তরের পর নামজারির ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য হবে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, শহরাঞ্চলে জমি ও ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্যের কারণে এসব সম্পদের মালিকদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনা যৌক্তিক।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চাইলে এখন আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এই নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
এ ছাড়া নিবাসী করদাতা কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হওয়ার ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হবে। তবে অনিবাসীদের ক্ষেত্রে এই শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
বাজেটে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা সীমিত করা হয়েছে। আগে বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হিসাব করে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা কর রেয়াত পাওয়া যেত। নতুন প্রস্তাবে বিনিয়োগের ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত রেয়াতের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফলে উচ্চ আয়ের করদাতারা আগের তুলনায় কম কর ছাড় পাবেন। বড় অঙ্কের বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে কর রেয়াত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায় শুধু নির্দিষ্ট সময় নয়, পুরো অর্থবছরজুড়েই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে আগে রিটার্ন দিলে করদাতারা বিশেষ সুবিধা পাবেন।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় মিলবে।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দিলে অতিরিক্ত কোনো ছাড় বা জরিমানা থাকবে না। জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন দিলে নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এপ্রিল থেকে জুনে রিটার্ন দিলে আরও বেশি হারে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব পরিবর্তনের ফলে কর ব্যবস্থার আওতা বাড়বে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের অনেক মানুষের জন্য নতুন নিয়ম কিছু বাড়তি প্রশাসনিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই বাস্তবায়নের সময় করদাতাদের হয়রানি এড়ানো এবং সেবাপ্রক্রিয়া সহজ রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

