প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়মে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে তিন মাস অন্তর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতে, এতে সুবিধার তুলনায় জটিলতা ও ঝুঁকিই বেশি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক খাত থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা আসার কথা রয়েছে ভ্যাট থেকে, যা সরকারের মোট আয়ের একটি বড় অংশ।
প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভ্যাট রিটার্ন জমার সময়সীমা এক মাস থেকে বাড়িয়ে তিন মাস করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর ফলে সরকারের নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে প্রতি মাস শেষে ভ্যাটের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রথম দুই মাস সেই অর্থ সরকারের হাতে না এসে ব্যবসায়ীদের কাছেই থাকবে। ফলে তাৎক্ষণিক ব্যয় মেটাতে সরকারের বিকল্প অর্থের উৎসের প্রয়োজন হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে সুদ বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়ও গুনতে হতে পারে।
এনবিআরের ভ্যাট নীতির দায়িত্বে থাকা সাবেক সদস্য ড. আব্দুর রউফের মতে, সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য নিয়মিত অর্থপ্রবাহ প্রয়োজন। ভ্যাটের অর্থ তিন মাস পরপর জমা হলে নগদ অর্থের সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক মন্দা বা আর্থিক চাপে কিছু প্রতিষ্ঠান ভোক্তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত ভ্যাটের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নতুন নিয়ম চালু হলে অনেক ব্যবসায়ী ভ্যাটের অর্থ চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহিত হতে পারেন। পরে তিন মাস শেষে এককালীন বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধের সময় এলে সেই অর্থ পরিশোধে সমস্যার মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।এতে বকেয়া ও খেলাপির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণকারী ব্যবসায়ীদের জন্যও বিষয়টি সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ভ্যাট রেয়াতের হিসাব তিন মাস পর মিলাতে গিয়ে জটিলতা বাড়তে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠান তিন মাস পর রিটার্ন দিলে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতাদের রেয়াত দাবি ও চালান যাচাইয়ের কাজও কঠিন হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া মাসিক রিটার্ন পদ্ধতিতে কোনো ভুল হলে পরবর্তী মাসেই তা সংশোধনের সুযোগ থাকে। কিন্তু ত্রৈমাসিক ব্যবস্থায় একটি ভুলের প্রভাব পুরো তিন মাসের লেনদেনের ওপর পড়তে পারে, যা সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে।
রাজস্ব প্রশাসনের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে কর ফাঁকি প্রতিরোধের কাজ করা হয়। কিন্তু তিন মাসের বিপুল তথ্য একসঙ্গে জমা হলে সেগুলো যাচাই, বিশ্লেষণ বা নিরীক্ষা করা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বকেয়া ভ্যাটের পরিমাণ বাড়লে এনবিআরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দাবিনামা এবং মামলা পরিচালনায় আরও বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মামলার জটও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভোক্তারা পণ্য বা সেবা কেনার সময়ই ভ্যাট পরিশোধ করেন। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় সেই অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে না গিয়ে তিন মাস পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে যাবে। ফলে সরকার ওই অর্থের তাৎক্ষণিক ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হবে। প্রয়োজন হলে ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হতে পারে, যার আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাঠপর্যায়ে কর্মরত ভ্যাট বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাইরে থেকে বিষয়টি সহজীকরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এটি সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

