বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন। তাই দেশের ভেতরের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রবাহ ও বিনিয়োগ সহজীকরণ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
তিনি বলেন, চলমান বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানির অস্থির মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের গতি ধীর হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সরকার দেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বিডা চেয়ারম্যানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই বন্ধ ও অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় শিল্পসম্পদের কার্যকর ব্যবহার, বেসরকারীকরণ এবং নগদীকরণের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনের পর প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। মোট বিনিয়োগেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। তবে অনেক বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কৌশল গ্রহণ করেছেন। তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়েও তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে বিডা এখন স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে এবং বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
জ্বালানি সংকটকে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্পকারখানার জন্য গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ সমস্যাই উদ্যোক্তাদের প্রধান অভিযোগ। এ সংকট দূর করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে বিডা।
তিনি আরও বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। তবে এ সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করে তিনি এখনই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ উৎস হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ কারণে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন চীন সফরে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলা বন্দরে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি মনে করেন, নতুন সরকারের প্রথম দুই বছর সাধারণত বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। তাই এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা সামনে আনতে চায় সরকার।
বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বর্তমানে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। আগে দুই ধাপে কাজের পরিকল্পনা থাকলেও এখন সবগুলো অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

