গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ভেতরে যে গভীর টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার একটি বিস্ফোরক চিত্র সামনে এসেছে নতুন এক বইয়ে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, গাজা উপত্যকা নিয়ে নিজের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে তিনি দুই দেশের ঐতিহাসিক মিত্রতার সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দুই অভিজ্ঞ সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথন সোয়ানের যৌথভাবে লেখা নতুন গ্রন্থে এই তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বইয়ের বিভিন্ন অংশ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত টেলিফোন আলাপ হয়। সেই সময় গাজায় যুদ্ধ থামানো এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন একটি বিশেষ শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছিল। তবে সেই পরিকল্পনা নিয়ে নেতানিয়াহুর অনীহা এবং আপত্তি ওয়াশিংটনকে ক্রমেই বিরক্ত করে তুলছিল।
ফোনালাপের সময় ট্রাম্পের বিশেষ শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনারও উপস্থিত ছিলেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছে, কথোপকথনের একপর্যায়ে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় নেতানিয়াহুকে বলেন, সবাই তার ওপর বিরক্ত। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইহুদি ব্যক্তিত্বরাও তার অবস্থানকে সমর্থন করছেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বইটির উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেন যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তার পাশে থেকেছেন, কিন্তু বর্তমান অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। গাজা নিয়ে সমঝোতার সুযোগ হাতছাড়া হলে শুধু আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কেও স্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে তা দুই নেতার সম্পর্কের অন্তরালের এক ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। কারণ প্রকাশ্যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন একে অপরের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে দেখা গেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ইরান প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রায়ই একসঙ্গে মিলেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটনের ধৈর্য কমতে শুরু করে। গাজায় মানবিক সংকট বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং শান্তি আলোচনা অগ্রগতি না হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছিল বলে বিভিন্ন মহল তখন থেকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানকে কেন্দ্র করে পরবর্তী আঞ্চলিক সংকট এবং শান্তি উদ্যোগের ব্যর্থতা ট্রাম্পের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে তেহরানকে পুরোপুরি চাপে রাখতে না পারা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় তিনি ইসরায়েলের যুদ্ধ কৌশল নিয়ে ক্রমেই সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত মতবিরোধের গল্প নয়। বরং এটি দেখায় যে, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেও কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে যুদ্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছিল, সেখানে ইসরায়েলের নেতৃত্ব নিরাপত্তা ও সামরিক লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষই শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের ভেতরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
বইটির এই প্রকাশিত অংশ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতটা ঐক্য ছিল এবং সেই ঐক্যের আড়ালে কতটা মতবিরোধ জমা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে অঞ্চলটির রাজনৈতিক ইতিহাস মূল্যায়নের সময় এই ধরনের গোপন আলাপ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

