ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থেকে সরে আসার পথে হাঁটছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও চূড়ান্ত বাজেটে এই বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাজেট ঘোষণার পরই প্রস্তাবটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কারণ, টিআইএন থাকলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এতে করযোগ্য আয় না থাকলেও অনেক মানুষকে রিটার্ন দাখিল করতে হতে পারে।
এর ফলে ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সরকার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। তবে প্রধানমন্ত্রী চীন সফর শেষে দেশে ফিরলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এনবিআর সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটের কয়েকটি বিষয় সংশোধনের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও রয়েছে। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে কোনো ধরনের আতঙ্ক বা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে চায় না সরকার। সে কারণেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরই কার্যকর হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন সনদ দেখানোর বিধান রাখা হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীদের হিসাব, ১০ টাকার হিসাব, সরকারি ভাতার হিসাব এবং পেনশনভোগীদের হিসাবের ক্ষেত্রে এই শর্ত থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
ব্যাংকারদের মতে, এখনো দেশের সামাজিক বাস্তবতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে সবার জন্য টিআইএন নেওয়া সহজ হবে। তাই এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাই বাস্তবসম্মত।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, এখনো অনেক মানুষের টিআইএন নেই এবং এটি সংগ্রহ করাও প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রক্রিয়া। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অনেকেই ব্যাংকে হিসাব না খুলে সমবায় বা অন্য বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারতেন। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ব্যাংক হিসাব রয়েছে ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি সঞ্চয়ী হিসাব এবং ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি ঋণ হিসাব।
সরকারের লক্ষ্য ছিল করের আওতা সম্প্রসারণ করা। তবে নতুন হিসাবধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবে ব্যাংক খাতে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় এখন সেই অবস্থান থেকে সরে আসার চিন্তা করছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অনানুষ্ঠানিক খাতে লেনদেন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই সরকার হয়তো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পথে যাচ্ছে। তাঁর মতে, ব্যাংক হিসাবের ওপর শর্ত আরোপের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক খাতকে ভ্যাট ও করের আওতায় আনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় অনেকেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকেই বড় অঙ্কের ব্যবসা ও লেনদেন চালিয়ে যেতে পারবেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক এবং ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়েছিল। এতে মোট করের হার ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
তবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি, দেশের উৎপাদন এখনো চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। তাই কাঁচামালের শুল্ক বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রক্রিয়াজাত খোসা ছাড়ানো কাজুবাদামের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা উচিত। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত বাজেটে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির শুল্ক কমানো এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এ ছাড়া বিজ্ঞাপনী সংস্থার ওপর উৎসে কর ছয় গুণ বাড়ানোর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটিও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই খাতে মোট বিলের শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ অথবা কমিশন ও ফি বাবদ প্রাপ্ত অর্থের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে উৎসে কর কাটা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের এজেন্সি সেবার ক্ষেত্রে মোট বিলের ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপের কথা বলা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত বাজেটে এই হার কমানো হতে পারে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

