দেশের বেসরকারি খাত এখনো গতি ফিরে পায়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত কর ও উচ্চ সুদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব নয়। নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি করের অর্থের অপচয় বন্ধ না হলে অর্থনীতিতে মন্দাভাব আরও গভীর হতে পারে।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। তারা বলেন, বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠনের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমেই কমছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীর কাকরাইলে দ্য ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল্লাহ। সঞ্চালনা করেন সদস্যসচিব মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এবার বাজেটের প্রচলিত কাঠামোয় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। তিনি জানান, অর্থনীতিকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে সরকার কাজ করছে, যাতে দেশের সব মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। তার ভাষ্য, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অর্থনীতির কারণে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে:
আলোচনা সভায় সাতজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, সরকার একই সঙ্গে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। তা না হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়তে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবারের প্রধান হিসেবে নারীদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। যদিও মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকার সহায়তায় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাহিদা সৃষ্টি হবে কি না, সে বিষয়ে তার সংশয় রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সায়মা হক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তবে তার মতে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে যুব বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা দূরেও আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ছাড়া বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনূস, কাজী ইকবাল এবং বুয়েটের শিক্ষক নাজমুল ইসলামও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরকারের একার পক্ষে এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে নীতি সুদহার প্রায় ৬ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এর প্রভাবেই গত দুই দশকের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাই সবার জন্য ঋণের সুদহার কমানোর আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, সুদ কমলে সক্ষম উদ্যোক্তারা দ্রুত নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, বাজেটে আমানতকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ব্যবসায়ী সংগঠন বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রশাসনিক দুর্বলতার কথাও তুলে ধরে বলেন, সেখানে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তাই এনবিআরে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক এ টি এম নূরুল আমিন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ইমরান মতিনসহ অন্যরা।

