একসময় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মুখ হিসেবে বিবেচিত হতেন কিন্তু পরিস্থিতি বদলালে সেই একই ব্যক্তিকে দায় চাপানোর সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। প্রশংসা, সম্মান কিংবা পুরস্কার—সবকিছু মুহূর্তেই হারিয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক আঞ্চলিক প্রধান নির্বাহী একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে তাকে ২০ শতাংশ বেতন কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি এতে রাজি না হওয়ায় কর্মপরিবেশ দ্রুত পাল্টে যায়। শুরু হয় অপমানজনক আচরণ ও চাকরি নিয়ে নানা ধরনের চাপ। শেষ পর্যন্ত আত্মসম্মান রক্ষার জন্য তিনি পদত্যাগ করেন।
কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি ঘটনা। পদত্যাগের পর জানতে পারেন, নির্ধারিত কর্মদক্ষতার অধিকাংশ লক্ষ্য পূরণ করলেও তার প্রাপ্য কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক বোনাস আর দেওয়া হবে না।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ভালো সময়ে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির কৃতিত্ব যাদের কাঁধে তুলে দেওয়া হয়, সংকটের সময় তারাই হয়ে ওঠেন বলির পাঁঠা। বছরের পর বছর পরিশ্রম, অর্জন ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে যায়, যখন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে কাউকে দায়ী করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি আরও সহজে তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ দুর্বল আইনি সুরক্ষা। কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আদালতের দ্বারস্থ হলেও মামলার নিষ্পত্তি হতে এত দীর্ঘ সময় লাগে যে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি অবসরে চলে যান। ফলে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতাবানদের জন্য এটি এক ধরনের সুবিধাজনক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
বর্তমান শ্রম আইনও এই শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। শিল্পকারখানার শ্রমিকদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা আইন ব্যবস্থায় উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপক বা প্রধান নির্বাহীরা অনেকটাই উপেক্ষিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মীদের জন্য আলাদা আইনি কাঠামো রয়েছে। ভারতে যেমন ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তারা শ্রমিক হিসেবে গণ্য না হলেও তাদের অধিকার চুক্তি, কোম্পানির পরিচালনব্যবস্থা এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশে একজন সিইও এমন অবস্থায় পড়েন, যেখানে তিনি শ্রমিক হিসেবে আইনি সুবিধা পান না, আবার মালিকেরও সমান অধিকার ভোগ করেন না।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ সালে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা যায়, ভারতে ৪০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহীদের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মদক্ষতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অর্থাৎ বোনাস কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি চাকরির চুক্তির অংশ। তাই নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পরও যদি কেবল মতের অমিল বা অপমান মেনে না নেওয়ার কারণে সেই বোনাস আটকে দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে ন্যায্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলা যায় না।
অবশ্য সব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। অনেক প্রতিষ্ঠান সুশাসন, জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও পেশাদার সংস্কৃতি গড়ে তোলে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান দুর্বল আইন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কর্মীদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করে। তাদের ধারণা, এমন বাজারে আইনি ঝুঁকি কম এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় কাগুজে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিবেদনই যথেষ্ট।
শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, তাদের পক্ষে সাধারণত কোনো শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বা জনসমর্থনের কাঠামো থাকে না। ফলে বড় পদে থাকলেও তারা সবসময় নিরাপদ নন। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে অসৎ বা দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তাদের হাত থেকেও প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে হবে। তাই আইনি কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যা কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে ন্যায়সঙ্গত হয়।
এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করা যেতে পারে। এসব দেশে লিখিত নিয়োগচুক্তি, মধ্যস্থতা, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, স্বচ্ছ চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়া এবং ক্ষতিপূরণের সুস্পষ্ট বিধান থাকায় দীর্ঘ আদালতনির্ভর জটিলতা অনেকটাই কমেছে।
বাংলাদেশেও এখন প্রয়োজন কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত আইনকে আধুনিক ও বিস্তৃত করা। বেসরকারি খাতের চাকরির নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি এমন আইন দরকার, যেখানে শ্রমিক, অফিসভিত্তিক কর্মী, ব্যবস্থাপক এবং শীর্ষ নির্বাহীদের পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করা, অর্জিত বোনাসের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের লিখিত নথি সংরক্ষণ, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং মধ্যস্থতা ও সালিশের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠন, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নীতিমালা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চাইলে ভয়ভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি দিয়ে তা সম্ভব নয়। যদি প্রধান নির্বাহীদের সবসময় অপমান সহ্য করে শুধু ঊর্ধ্বতনদের সন্তুষ্ট রাখার চিন্তায় কাজ করতে হয়, তাহলে তারা সাহসী নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। সত্য কথা বলার বদলে তারা নীরব আনুগত্যকেই নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নেবেন। এতে উন্নয়ন নয়, বরং নির্ভরশীলতার সংস্কৃতিই শক্তিশালী হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইলে কেবল বিদেশি পুঁজি নয়, ন্যায্য ও শালীন করপোরেট আচরণও নিশ্চিত করতে হবে।
- মাহতাব উদ্দিন আহমেদ: বিল্ডকন কনসালটেন্সিজ লিমিটেড এবং বিল্ডনেশন লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা।

