নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় একটি বড় পরিসরের বাজেট প্রস্তাব করেছে। সরকার এবারের বাজেটকে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে তুলে ধরেছে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন চলছে। নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৩০ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত বাজেট নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এর বাস্তবায়ন সক্ষমতার বিষয়টি। বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে আশাবাদ থাকলেও সেই লক্ষ্য কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে গুণগত বাস্তবায়নের প্রশ্নে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
এবারের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় সংস্থাটি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে সফল না হলেও এবার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এনবিআরের মতে, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং ব্যাপকভাবে বিনিয়ন্ত্রণীকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে। আর এর প্রভাব রাজস্ব আহরণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের অষ্টম অধ্যায়ে বিনিয়ন্ত্রণীকরণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর করতে প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত সময়, বিনিয়োগ এবং বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার। অতীতে এ ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত স্বয়ংক্রিয় সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিনিয়োগ যদি জিডিপির ৩১ শতাংশ হয়ে থাকে, তাহলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৩২ লাখ কোটি টাকা। সেই হার ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ২৪ দশমিক ৯৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ৫ দশমিক ৬১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
বর্তমান বাস্তবতায় অর্থায়নের বড় উৎস হিসেবে ব্যাংক খাতও আশাব্যঞ্জক অবস্থায় নেই। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে বিদ্যমান অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানই টিকে থাকার লড়াই করছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবেশও কঠিন হয়ে উঠেছে। একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও।
বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও এসব অর্জনের অন্যতম শর্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী ভ্যাট বৃদ্ধির যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তাতে স্থানীয় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের গতি বাড়ানোর বিকল্প নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এদিকে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপরই করের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে করদাতার সংখ্যা ছিল ১২ লাখ। এর মধ্যে কর পরিশোধ করতেন ৩ দশমিক ৪ থেকে ৩ দশমিক ৮ লাখ ব্যক্তি। তখন আয়কর থেকে আদায় হতো ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে করদাতার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ কর পরিশোধ করছেন এবং আয়কর আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ১ কোটি টাকায়। ফলে গড়ে রিটার্ন দাখিলকারীদের কর পরিশোধের পরিমাণ আগের তুলনায় সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, একই সময়ে কি সবার আয়ও সমান হারে বেড়েছে? বিশ্লেষকদের মতে, করের আওতা কিছুটা বিস্তৃত হলেও এখনো সবাই কর দিচ্ছেন না। ফলে যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করেন, তাদের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে অনেক করদাতা ধীরে ধীরে কর প্রদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করদাতার সংখ্যা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কর রিটার্ন দাখিলকারীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের করদাতা থাকায় শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে কর আদায় বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়লে করপোরেট করের মাধ্যমে রাজস্বও বাড়বে এবং অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসা সহজ করার লক্ষ্যে একাধিক বিনিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সাত দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সরকারি সংস্থা মতামত, অনাপত্তি বা ছাড়পত্র না দিলে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা সম্মতি হিসেবে বিবেচনা করে আবেদন নিষ্পত্তির প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। বাস্তবায়ন হলে এসব উদ্যোগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ শিল্প সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দ্রুত কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। তবে এ উদ্যোগ সফল করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে দেশে একাধিক শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা হলেও অনেক এলাকায় এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি সংযোগের ঘাটতির কারণে অনেক বিনিয়োগকারী জমি বরাদ্দ পেলেও সময়মতো উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। ফলে বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বাজেটে অটোমেটেড ও ফেসলেস করব্যবস্থা চালু, সব ধরনের রপ্তানির জন্য সমান সুবিধা এবং বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণের মতো একাধিক পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
আলোচনায় উঠে এসেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ১৮ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকার বকেয়া রাজস্ব রয়েছে। এই অর্থ পুরোপুরি আদায় করা গেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায়ের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষিত আছে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো এনবিআরকে ঘিরে এক ধরনের ভীতি রয়েছে। এই মানসিকতা দূর না হলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে উৎসে কর থেকে, যা মোট আয়করের প্রায় ৮৪ থেকে ৮৭ শতাংশ। উৎসে করের আওতা সম্প্রসারণের ফলে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায় হতে পারে। এতে আয়কর খাত থেকে মোট রাজস্ব প্রায় ১ দশমিক ৮৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে সরকার একদিকে পুঁজিবাজারকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বললেও করপোরেট লভ্যাংশের ওপর বিদ্যমান কর-সুবিধা প্রত্যাহার করে করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে রিয়েল এস্টেট খাতের মূলধনি করকে অগ্রিম করের আওতায় আনার ফলে এ খাত থেকেও অতিরিক্ত রাজস্ব আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাজেটে কয়েকটি শিল্প খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হলেও উদীয়মান অনেক শিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামালের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সরকার একদিকে আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তুলতে এবং অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহ দিতে চায়। তবে এই দুই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ভারসাম্য বজায় রাখা, বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু করা, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো এবং উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সহজ হবে না।

