জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক ও কর আদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিগারেট খাত। প্রতি অর্থবছরই এই খাত থেকে সর্বাধিক রাজস্ব আসে। তবে চলতি অর্থবছরে প্রত্যাশিত রাজস্ব অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও শেষ পর্যায়ে এসে সেই গতি অনেকটাই থেমে গেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) সিগারেট খাত থেকে শুল্ক ও কর আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট প্রবেশ। এসব সিগারেটে কোনো শুল্ক বা কর পরিশোধ করা হয় না। ফলে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় অনেক ক্রেতা সেদিকে ঝুঁকছেন। এতে বৈধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমছে এবং সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে সিগারেট থেকে মূলত সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আসে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের সিগারেটের খুচরা মূল্যের প্রায় ৮৪ শতাংশই বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
সিগারেট খাতের অন্যতম বড় রাজস্বদাতা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিক্রিও কমেছে। কোম্পানির জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের বিক্রি হয়েছে ৮ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার সিগারেট। আগের বছরের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে ৮৭২ কোটি টাকা। এনবিআর সূত্র জানায়, শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, অন্যান্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রিতেও একই ধরনের পতন দেখা গেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সিগারেট খাত থেকে শুল্ক ও কর আদায় হয়েছিল ৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় যা ছিল ৩৯৪ শতাংশ বেশি। পরবর্তী দুই মাসেও প্রবৃদ্ধি ছিল ১০০ শতাংশের ওপরে।
কিন্তু এরপর থেকেই রাজস্ব আদায়ের গতি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে মোট আদায় দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৩৫ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি এখন ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বছরের শুরুতে ৩৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কমে ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত শুল্ক ও কর পরিশোধ করে বাজারে এসেছে ৬ হাজার ১২৩ কোটি ৬২ লাখ শলাকা সিগারেট। বৈধভাবে বাজারে আসা সিগারেটের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশের বেশি কমেছে।
অবৈধ সিগারেটই কি বড় কারণ?
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধ সিগারেটের সরবরাহ বাড়ায় বৈধ বাজার সংকুচিত হয়েছে। যখন অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়, তখন এসব পণ্যের সরবরাহ কমে আসে এবং বৈধ বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া সিগারেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে সিগারেট বাজারজাত করার অভিযোগও রয়েছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। সংস্থাটির একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে দেশি ও বিদেশি অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে ১৩ হাজারের বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজারের বেশি অভিযান সফল হয় এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সিগারেট জব্দ করা হয়। সে সময় এনবিআরের তৎকালীন সদস্য বেলাল হোসাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অভিযানের কারণে বাজারে কর ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের সরবরাহ কমে এসেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে অভিযান শিথিল হয়ে যাওয়ার পর আবারও অবৈধ সিগারেটের সরবরাহ বেড়েছে বলে দাবি করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, চোরাচালানের মাধ্যমে সিগারেট বাজারে প্রবেশ করলে বড় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ওপর।

