রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দামে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ইস্পাতজাত পণ্যের মূল্য এখনও তুলনামূলক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, মৌসুমি সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রড, সিমেন্ট, বালু ও পাথরের দামে নিয়মিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাদের ভাষ্য, চলমান বর্ষা মৌসুম, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং দূরপাল্লার পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে স্থিতিশীলতা নেই। এর প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি পর্যায়ে বাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে আবাসন খাতের সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর। ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে রড ও সিমেন্টের দাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬০ গ্রেডের এমএস রড প্রতি মেট্রিক টন ৮৮ হাজার থেকে ৯২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪০ গ্রেডের রডের দাম রয়েছে ৭৭ হাজার থেকে ৮৪ হাজার টাকার মধ্যে।
সিমেন্টের বাজারেও স্বস্তি নেই। প্রতি বস্তা হোলসিম সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ টাকায়, আকিজ সিমেন্ট ৫৪০ টাকায় এবং ফ্রেশ ও ইস্টার্ন সিমেন্ট ৫১৫ টাকায়। এছাড়া সাধারণ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত পিসিসি সিমেন্টের দাম কোম্পানিভেদে ৪৮০ থেকে ৫৩০ টাকার মধ্যে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বাড়ায় এসব পণ্যের দামও বেড়েছে।
বালু ও পাথরের বাজারও পরিবহন এবং উৎসভেদে মূল্য পরিবর্তনের মুখে রয়েছে। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট সিলেকশন বা লোকাল বালুর দাম ১৭ থেকে ২৭ টাকা। সিলেটের লাল বালু বিক্রি হচ্ছে ৩৭ থেকে ৪৫ টাকায় এবং ভিটি বা ভরাট বালুর দাম ৮ থেকে ১২ টাকা। ছাদ ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহৃত মাঝারি মানের সিলেকশন বালুর ১০ চাকার একটি ট্রাক, যার ধারণক্ষমতা প্রায় ৯৫০ থেকে ১ হাজার ঘনফুট, বিক্রি হচ্ছে ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায়।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার মেসার্স মনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারীর মতে, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে বালুর দাম নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় বালু পরিবহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ট্রাকভাড়া মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।
পাথরের বাজারেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভারত ও ভুটান থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে দেশি থ্রি-ফোর সাইজের পাথর প্রতি ঘনফুট ১২৩ থেকে ১২৫ টাকায় এবং ভুটানি পাথর ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দূরবর্তী এলাকা থেকে ঢাকায় বালু বা পাথর পরিবহনের উচ্চ ব্যয় এবং পরিবহন খাতের সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় এসব পণ্যের দাম আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়।
অন্যদিকে ইটের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে প্রথম শ্রেণির সাধারণ ইট প্রতি পিস ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উন্নতমানের সলিড অটো ব্রিকসের দাম ১২ থেকে ১৫ টাকা এবং ১০-হোল বা স্টোন ব্রিকস বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ টাকায়। ব্যবসায়ীরা জানান, পোড়া মাটির ইটের বিকল্প হিসেবে ফ্লাই-অ্যাশ, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব সলিড অটো ব্রিকসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বাজেটে আরোপিত কর, জ্বালানির মূল্যজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্যের সম্মিলিত প্রভাব নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত বাজেটের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা ব্যক্তি ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান—উভয়ের জন্যই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ফ্ল্যাট হস্তান্তরেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখা এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

