সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এটি তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামোর মূল বেতন কার্যকর হতে পারে। তবে নতুন ভাতা চালু হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে। একই সঙ্গে নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় বেতন বৃদ্ধির হার কিছুটা কমানোর বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, নতুন অর্থবছর থেকেই সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোর আওতায় বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, শুরুতে বাস্তবায়ন কমিটি নতুন বেতনকাঠামো তিন ধাপে কার্যকর করার সুপারিশ করেছিল। সে প্রস্তাবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কমিশনের সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের ১ জুলাই বাকি ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা কার্যকর করার কথা ছিল।
তবে বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কমিটি দেখতে পায়, এই পদ্ধতিতে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেক কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে নতুন কাঠামোর ৫০ শতাংশ কার্যকর হলেও প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুবই সীমিত হবে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মোট বেতন কমে যাওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়। এ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের আপত্তির পর বাস্তবায়ন কমিটি পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করে। এখন নতুন প্রস্তাবে আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন মূল বেতন কার্যকর এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন ভাতা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারেই পুরো বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা যেত। তবে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়ন করাও ইতিবাচক হবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারি কর্মচারীদের রাজস্ব সংগ্রহে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাসচিব, স্বাস্থ্যসেবাসচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতনকাঠামোর প্রতিবেদনও প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। এখন শুধু সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষা।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পাশাপাশি এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তাই সরকারি কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিমুক্ত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
বর্তমানে অষ্টম বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা। নবম বেতন কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব বেশি নয়।
তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সম্পদের ব্যবহার অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। তাঁদের মতে, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গত ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ঘাটতি, ঋণ গ্রহণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

