নতুন অর্থবছর শুরুর আগেই রাজধানীর সোনালী ব্যাংকের ভিকারুননিসা নূন স্কুল শাখায় সঞ্চয়পত্র নবায়নের জন্য হাজির হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সায়মা ইসলাম। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবসরের পর সঞ্চয়পত্রের মুনাফাই তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। নতুন অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত কমানোর সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্র নবায়ন করতে এসেছেন।
সায়মা ইসলামের মতো আরও অনেক গ্রাহক এখন একই কারণে ব্যাংকে ভিড় করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সংশ্লিষ্ট শাখা ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য সেবার তুলনায় সঞ্চয়পত্র ডেস্কেই সবচেয়ে বেশি চাপ। কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতিতে পড়ছেন, কারও মোবাইল নম্বর নিজের নামে নিবন্ধিত না থাকায় কাজ আটকে যাচ্ছে। আবার সব শর্ত পূরণ থাকলেও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কর্মকর্তাদের দ্রুত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রের কর রেয়াত কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সঞ্চয়পত্র কেনা ও নবায়নের আবেদন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের কর সুবিধায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। বর্তমানে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়। ১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার ১০ শতাংশ। বিদ্যমান নিয়মে এই উৎসে কাটা করই চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরে ওই আয়ের ওপর আর আলাদা কর দিতে হয় না।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এই সুবিধা আর থাকবে না। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা করদাতার মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং প্রচলিত করস্ল্যাব অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা হবে। উৎসে কাটা অর্থকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হবে, যা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয় করা যাবে।
এর ফলে তুলনামূলক কম অঙ্কের সঞ্চয়পত্রধারীরাও বাড়তি করের আওতায় আসতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে, আগে যেখানে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ কর দিলেই দায়িত্ব শেষ হতো, এখন তাকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে।
শুধু কর পরিশোধের নিয়ম নয়, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের সীমাও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের বিপরীতে যে কর ছাড় পাওয়া যায়, তা কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগে করদাতারা আগের তুলনায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা কম কর ছাড় পাবেন।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের মধ্যে। তাদের বক্তব্য, দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ এখনো সীমিত। অবসরের পর কিংবা নিয়মিত আয় না থাকলে সঞ্চয়পত্রই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা। সেই জায়গায় করের বোঝা বাড়লে তাদের মাসিক ব্যয় পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই আর্থিক চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে কর সুবিধা কমে গেলে একই পরিমাণ সঞ্চয় ধরে রাখলেও আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় সঞ্চয়পত্র দেশে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে আসছে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া ব্যক্তি, প্রবাসী পরিবারের সদস্য, বিধবা নারী এবং স্থায়ী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ মেটান। তাই কর রেয়াত কমে যাওয়া তাদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার সমান বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয়পত্রের কর রেয়াতের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে যারা শেয়ারবাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যেতে চান না, তাদের জন্য এটি দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প।
তাদের আশঙ্কা, কর সুবিধা কমে গেলে অনেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। একই সঙ্গে নিয়মিত করদাতা ও সঞ্চয়প্রবণ নাগরিকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে কর ফাঁকি বেশি হয় এমন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। নিয়মিত করদাতা ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়ানো কার্যকর সমাধান নয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশে সঞ্চয়ের প্রবণতা আগেই কমেছে। ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধিও কম। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় করার সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এই অবস্থায় সঞ্চয়ের ওপর কর-প্রণোদনা কমানো হলে মানুষ হয় ভোগ ব্যয় বাড়াবে, নয়তো অনানুষ্ঠানিক বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকবে, যা আর্থিক খাতের জন্য ইতিবাচক হবে না।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ আয়ের মানুষ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু সীমিত আয়ের চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্তদের জন্য সঞ্চয়পত্রই সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প। ফলে কর রেয়াত কমার প্রভাব সরাসরি তাদের পারিবারিক ব্যয়ের ওপর পড়বে।
তার মতে, রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর উপায় হলো নতুন করদাতা যুক্ত করা, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি কমানো। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বন্ধ করা যেতে পারে। তবে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের প্রণোদনা কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন সহজ হবে না।
সরকারের যুক্তি, কর অব্যাহতির পরিমাণ ধীরে ধীরে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর ছাড় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে কর কাঠামোকে আরও সমতাভিত্তিক করতে বিভিন্ন খাতে কর রেয়াত সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে কর অব্যাহতি কমিয়ে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঞ্চয়পত্রে কর সুবিধা কমলে কিছু অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসতে পারে। তবে যদি ব্যাংকের প্রকৃত সুদের হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে, তাহলে অনেকেই ব্যাংকে অর্থ রাখার বদলে জমি, স্বর্ণ কিংবা অন্য সম্পদে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে তহবিল সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই নিয়মিত কর দেয়, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় অংশ হিসেবে ভূমিকা রাখে। এই শ্রেণির ওপর ধারাবাহিক আর্থিক চাপ বাড়লে তাদের ভোগক্ষমতা কমবে, যার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকা পরিবারগুলোকে আরও হিসাব করে চলতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, রাজস্ব আদায় এবং সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার চাইলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের সঞ্চয়কারীদের জন্য আলাদা কর সুবিধা, ধাপে ধাপে কর রেয়াত অথবা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পূর্ণ কর অব্যাহতির মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত কমানোর প্রস্তাব সরকারের রাজস্ব নীতির অংশ হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্ত ও স্থায়ী আয়ের মানুষের ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণে জোর দিলে একদিকে সরকারের আয় বাড়বে, অন্যদিকে সঞ্চয়প্রবণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাও সুরক্ষিত থাকবে।

