ব্যবসায়ী ও সাধারণ করদাতাদের জন্য নতুন করে একাধিক কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আলোচনায় থাকা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সোনা বিক্রির মুনাফার ওপর ক্যাপিটাল গেইনস কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর হ্রাস, অনলাইন বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমানো এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের সময়সীমা শিথিল করা।
এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আজ সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের সময় এসব পরিবর্তনের ঘোষণা আসতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সোনা বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয়ের ওপর ক্যাপিটাল গেইনস করের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর বর্তমানে কার্যকর ১০ শতাংশ কর অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এছাড়া প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ দুই কাঁচামাল—পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের আমদানির ওপর সম্প্রতি বাড়ানো শুল্ক প্রত্যাহার করে আগের হারে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। অনলাইন বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর থাকলেও তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে ভ্যাট পরিশোধের নিয়মে। বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট জমা দিতে হলেও নতুন বিধানে তিন মাস অন্তর ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ রাখা হতে পারে। পাশাপাশি তামাক কোম্পানিগুলোর সম্পূরক শুল্কেও বিশেষ ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। অন্যদিকে আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে অর্থ বিনিয়োগের যে বিধান প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা বাতিল হতে পারে।
ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমাও ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী দুই করবর্ষে এই সীমা ৪ লাখ টাকা থাকবে। পরবর্তী দুই করবর্ষে তা বেড়ে হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হতে পারে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু সিদ্ধান্ত করদাতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে—এমন বিবেচনায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কয়েকটি ক্ষেত্রে করহার কমানো বা বিধান সহজ করার নির্দেশনা এসেছে। সেই কারণেই একাধিক কর ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে তার মতে, এসব ছাড় কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে অনেক করদাতা তাদের আয়কর রিটার্নে ৩০ থেকে ৪০ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণের মালিকানা দেখিয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব ঘোষণার একটি বড় অংশ বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। পরবর্তীতে বড় ধরনের ব্যয়ের উৎস হিসেবে অনেকেই সোনা বিক্রির অর্থ দেখিয়ে থাকেন। এতদিন এই ধরনের আয়ের ওপর আলাদা কোনো কর ছিল না।
এবারের বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছিল, সোনা বিক্রির মূল্য থেকে ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকবে, সেটিকে ক্যাপিটাল গেইনস হিসেবে গণ্য করে তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। তবে এই প্রস্তাবের সমালোচনা হওয়ায় করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিন আমদানিতে স্থানীয় উৎপাদকদের সুরক্ষার জন্য সরকার শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছিল। কিন্তু শিল্পমালিকদের আপত্তির মুখে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই দুই কাঁচামাল পাইপ, পানির ট্যাংক, প্যাকেজিং সামগ্রী, চিকিৎসাসামগ্রী, ইলেকট্রনিক পণ্য, যানবাহনের যন্ত্রাংশ, পানীয়ের বোতল এবং ওষুধের মোড়ক তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি ছিল, শুল্ক বাড়লে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
অনলাইন বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও সরকার ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এ খাতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ হলেও সিঙ্গাপুরে ৯ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫ শতাংশ। তুলনামূলক বেশি ভ্যাটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশের মাধ্যমে অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করে থাকে। এতে বাংলাদেশ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। ভ্যাটের হার কমিয়ে এই অর্থ দেশে আনতে এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতেই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাজেটে আবাসন খাতে এমন একটি বিধান আনা হয়েছিল, যার মাধ্যমে অতীতে কোনো সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে দলিলে উল্লেখিত মূল্যের বাইরে প্রকৃত মূল্য বা অতিরিক্ত অর্থ দেখালেও সেই অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সংস্থা প্রশ্ন করতে পারবে না। তবে ব্যাপক সমালোচনার পর এই বিধান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ তৈরি করতে পারত। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও এ প্রস্তাবের সমালোচনা করেছিল। যদিও এনবিআর চেয়ারম্যান বারবার দাবি করেছিলেন, বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের কোনো আইনি সুযোগ রাখা হয়নি। তবে আয়কর বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিতর্কিত এই প্রস্তাব পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফলে আগের নিয়মই বহাল থাকবে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, প্রযোজ্য করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করা গেলেও কোনো ধরনের দায়মুক্তি মিলবে না। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট যেকোনো সংস্থা সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারবে। ফলে কার্যত বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে না।

