নবনির্বাচিত সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট দেশের অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছে। বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের মতো ১০টি অগ্রাধিকার খাত এতে স্থান পেয়েছে। এসব লক্ষ্য দেশের বর্তমান উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। অথচ বিদায়ী অর্থবছরের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত হিসাব ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী তা ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এক অর্থবছরের ব্যবধানে এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগের হার খুব সামান্য বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবে জিডিপির ২১ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধরা হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে এই খাতে স্থবিরতা রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ১০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগে শক্তিশালী পুনরুদ্ধারই হবে মূল নির্ধারক।
মূল্যস্ফীতি কমানোও কঠিন লক্ষ্য:
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত চলমান গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির কারণ এখন শুধু মুদ্রানীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানির ব্যয়, বিনিময় হার সমন্বয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা এ পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
তাই শুধু কঠোর মুদ্রানীতি নয়, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধা দূর করা এবং বাজার তদারকি জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। অথচ ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতা, ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি এবং আর্থিক খাতের চাপ ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—উভয়কেই সীমিত করে রেখেছে। ব্যবসায়িক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
বাজেটে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগামী কয়েক বছরে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব প্রত্যাশা বাস্তবায়নের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ অনুকূল থাকা, দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। এছাড়া বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিও রপ্তানিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজস্ব আদায়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ:
প্রস্তাবিত বাজটে সরকারি ব্যয় সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে, যা দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু গত এক দশকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রাজস্ব সংগ্রহ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে নতুন লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তব আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি প্রয়োজন হবে।
বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর আদায় বৃদ্ধির ওপর বড় আশা রাখা হয়েছে। করজাল সম্প্রসারণ, করদাতার তথ্যভান্ডার সমন্বয় এবং কর পরিপালন বাড়ানোর উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের পথে এখনও বড় বাধা রয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপরও বড় নির্ভরতা রাখা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি ঋণের অর্থছাড় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের সমস্যা রয়েছে। ক্রমেই স্বল্পসুদে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। এর জন্য দেশের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং ঋণদাতাদের শর্ত পূরণে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়লে প্রত্যাশিত বৈদেশিক অর্থায়ন পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে, যা বাজেট বাস্তবায়নে ঝুঁকি তৈরি করবে।
কর ব্যবস্থায় ইতিবাচক দিক:
এই বাজেটে করনীতিতে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত আয়করের হার ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত এবং করপোরেট করহার ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরি করবে।
সময়মতো কর রিটার্ন জমা দেওয়ার উৎসাহ, কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর এবং তথ্যভান্ডার সমন্বয়ের মাধ্যমে কর আদায় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধশিল্প এবং ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য কর প্রণোদনাও রাখা হয়েছে।
করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। তবে পরোক্ষ করের ওপর সরকারের নির্ভরতা অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের ব্যয়চাপ আরও বাড়তে পারে।
সরকার ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে অঙ্গীকার করেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যায় না। এতে ধরে নেওয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেই কর্মসংস্থানও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়লেই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। এজন্য শ্রমঘন শিল্পের প্রসার, রপ্তানি সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মুক্ত পেশাজীবী, নারী উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বিভিন্ন সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এগুলো আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে পারে। তবে সরকারের প্রত্যাশিত মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্ম এবং শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি সরকারের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। দুর্বল বাস্তবায়ন, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দূর না হলে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়বে না।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে পরিবার কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় এটি দরিদ্র পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে। যদি এটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তবে সফলতার জন্য প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, অপচয় ও অনিয়ম কমানো, সারা দেশে যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নতুন সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক সূচনা বলা যায়। তবে কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকারি প্রতিটি ব্যয় দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে বাস্তব সুফল বয়ে আনে।

