বাংলাদেশের অর্থনীতি টানা চার বছর ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ব্যাংকে তারল্য সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ এখনো কাটেনি। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে এবং বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতার আভাস মিলছে, তবু বেসরকারি খাতের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এমন বাস্তবতায় প্রণয়ন করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট।
এই বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। আবার পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানিতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। বাজেটে সরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের ১০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৩ দশমিক ১ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের গতি ফেরানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আগামী অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অথচ আগের সংশোধিত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে না; এটি এখন অনেকটাই কাঠামোগত সমস্যার রূপ নিয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের সমন্বয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। তাই শুধু কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োগ করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এর পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির প্রাপ্যতা বাড়ানো, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধা দূর করা এবং বাজার তদারকি জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিয়েও বাজেটে আশাবাদী পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি, ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি এবং আর্থিক খাতের চলমান দুর্বলতা ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। ফলে ব্যবসার পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
বৈদেশিক খাতেও বাজেটে আশাবাদের প্রতিফলন দেখা যায়। রপ্তানি আয় দ্রুত বাড়বে, একই সঙ্গে আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বাড়তে থাকবে এবং মধ্যমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হয়েছে। তবে এসব পূর্বাভাস বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর।
রাজস্ব আহরণ নিয়েও বাজেটে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় মোট সরকারি ব্যয় প্রায় ১৯ শতাংশ এবং মোট রাজস্ব আয় ১৮ দশমিক ২ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আহরণের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবে রাজস্ব আদায়ে ব্যতিক্রমধর্মী সাফল্য প্রয়োজন হবে। বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে, বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছে। কর পরিপালন বৃদ্ধি, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং করদাতাদের তথ্যভান্ডার সমন্বয়ের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ ধরা হয়েছে। এটি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিকে আরও সংকুচিত করতে পারে। একই সময়ে উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের জন্য বৈদেশিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলেও বাজেটে ধরা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে বিলম্বের সমস্যায় ভুগছে। পাশাপাশি বৈদেশিক অনুদান কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন হবে শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত রাষ্ট্রীয় ঋণযোগ্যতা এবং ঋণদাতাদের শর্ত যথাযথভাবে পূরণের সক্ষমতা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বাজেটের ঘোষণার তুলনায় কার্যকর পদক্ষেপ সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে। শ্রমঘন শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তায় আরও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এসব বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে পারিবারিক সহায়তা কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, অপচয় ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
সব দিক বিবেচনায় এবারের বাজেট একটি আশাবাদী অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী রাজস্ব প্রশাসন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া বাজেটের অনেক সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, বাজেটের প্রতিটি ব্যয় যেন দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব এবং দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- ড. ফাহমিদা খাতুন সিপিডির অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক

