দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে আগামী জুলাইয়ের মাঝামাঝি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নবম পে-স্কেলের পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে দুই ধাপের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তবে সেই পরিকল্পনার মধ্যেও আগামী জুলাই থেকেই নতুন স্কেলের সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটি পে কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত তিনটি পৃথক পে কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কমিটি তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে সরকার নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য দুইটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছিল। একটি ছিল তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং অন্যটি দুই ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা। তিন বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে কার্যকর করা এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা চালুর চিন্তা ছিল।
তবে অর্থ বিভাগ জানায়, দুই ধাপে মূল বেতন কার্যকর করলে সরকারের ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবিএএসপ্লাসপ্লাস)-এ কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে। সে কারণে একবারেই সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনার দিকেই এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। আশা করা হচ্ছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি অথবা তার পরের সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হবে। সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমান ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডে ১০০ শতাংশ বা তার কিছুটা কম বেতন বৃদ্ধি হতে পারে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের কর্মীদের ক্ষেত্রে গড়ে ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। আগের পে-স্কেল সংশোধনের মতো এবারও বাজেট নথিতে বেতন-ভাতা খাতে আলাদা করে কোনো বৃদ্ধি দেখানো হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন বরাদ্দ নেট পাবলিক সার্ভিস খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে ৪৪ হাজার কোটি টাকার এই বরাদ্দ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ে ব্যয় করা হবে।
নবম পে কমিশন মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধিরও সুপারিশ করেছে। এর আগে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রথম বছরে সংশোধিত মূল বেতন এবং পরের বছরে সংশোধিত ভাতা কার্যকর হয়। বর্তমানে সরকারের প্রায় ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।

