দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডলারের দাম আবারও বেড়েছে। সোমবার কয়েকটি ব্যাংকে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা দরে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের ব্যবধানে এই দর প্রায় ৭০ পয়সা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার দেশের কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা দরে এলসি নিষ্পত্তি করেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা দরে পাওয়া গেলেও এখন একই ডলারের জন্য ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০ লাখ ডলারের একটি এলসি নিষ্পত্তিতে আগের তুলনায় প্রায় ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক বেশি দামে ডলার কেনায় বাজারে ডলারের দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, কোনো ব্যাংক রেমিট্যান্স হাউজ থেকে উচ্চমূল্যে ডলার কিনলে অন্য রেমিট্যান্স হাউজগুলোও একই বা কাছাকাছি দামে অন্য ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রির চেষ্টা করে। এতে পুরো বাজারেই অস্থিরতা তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ডলার সংগ্রহ করলেও বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। কারণ যে দামে ডলার কেনা হয়, এলসি নিষ্পত্তির সময় তার সঙ্গে লাভের মার্জিন যোগ করে বিক্রি করা হয়।
কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন, কিছু ব্যাংক বেশি দামে ডলার কিনছে এবং এর প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। তাদের মতে, যারা অস্বাভাবিকভাবে ডলারের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তারা মনে করিয়ে দেন, ২০২২ সালের শেষ দিকে কয়েকটি ব্যাংকের অতিরিক্ত দামে ডলার কেনার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি জ্বালানি তেল আমদানির এলসি পরিশোধের চাপ বর্তমানে ডলারের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দুই মাস আগে খোলা এলসিগুলোর নিষ্পত্তিতে এখন বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এদিকে জুন মাসে প্রবাসী আয়ও তুলনামূলকভাবে কমেছে। জুনের প্রথম ২৮ দিনে দেশে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও গত ছয় মাসে প্রায় প্রতিটি মাসেই ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল।
রপ্তানি আয়েও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত মে মাসে রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই মাসে এই আয় ছিল ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকারদের মতে, সরকারের জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ডলারের চাহিদা বেশি থাকলেও সেই তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কম। ফলে বাজারে ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
তাদের ধারণা, সামনে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হওয়ায় এলসি খোলার হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু হলে এলসি খোলা বাড়বে এবং তখন ডলারের চাহিদাও আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
ব্যাংকারদের দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে বিনিময় হার প্রকাশ করছে, বাস্তব বাজারে লেনদেন তার চেয়ে বেশি দামে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ডলারের দর ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা দেখালেও বাজারে প্রকৃত কেনাবেচা এর চেয়ে বেশি দামে সম্পন্ন হচ্ছে। সোমবার বিভিন্ন ব্যাংকের বিসি সেলিং রেট ছিল প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, যা তার মতে সঠিক নয়। তিনি বলেন, ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। বর্তমানে রেমিট্যান্স যে দামে কেনা হচ্ছে, সেটিই প্রকৃত বাজারদর। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক গড় হিসাব দেখিয়ে ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা নির্ধারণ করছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। তিনি আরও বলেন, ইন্টারব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার কার্যকরভাবে চালু করা জরুরি হলেও এখনো সেটি পুরোপুরি সচল হয়নি।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান জানান, অধিকাংশ ব্যাংক এখন ইন্টারব্যাংক মার্কেটের পরিবর্তে রেমিট্যান্স হাউজ থেকেই ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা দরে ডলার কিনছে। ফলে ইন্টারব্যাংক মার্কেটে লেনদেন খুবই সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ কর্মদিবসে ইন্টারব্যাংক মার্কেটে মোট সাড়ে ৬৩ মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে।
আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ডলারের দর প্রকাশ করছে, বাস্তবে বাজারে লেনদেন হচ্ছে তার চেয়ে বেশি দামে। ফলে ঘোষিত বিনিময় হার বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন দিচ্ছে না।

