জাতীয় সংসদে অর্থ বিল ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য কর রেয়াতের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে কর আরোপ এবং কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়নি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ব্যক্তিগত আয়করের করমুক্ত সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার কণ্ঠভোটে অর্থ বিলটি পাস হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন। সংশোধিত আইনে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সব ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আড়াই শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। আগে এই সুবিধা নির্দিষ্ট কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে।
কর বিশেষজ্ঞ লুৎফুল হাদী বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যাংকিং চ্যানেল ও মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়ানো। এর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
তবে তিনি মনে করেন, দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি উন্নত না হওয়ায় সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হতে পারে। তাই সীমিত পরিমাণ নগদ লেনদেনের সুযোগ রেখেও কর ছাড় বহাল রাখার পরামর্শ দেন তিনি। এতে প্রণোদনাটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে বলে তার মত।
আয়কর নীতি বিভাগের প্রথম সচিব মো. জাফর ইমাম জানান, বর্তমানে যেসব কোম্পানি ২২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর দেয়, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই এই কর ছাড়ের আওতায় আসবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসার ধরন অনুযায়ী বিশেষ কর সুবিধা ভোগ করছে, তারা এই অতিরিক্ত কর রেয়াত পাবে না।
অর্থ বিলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ কর বহাল রাখা হয়েছে। ফলে এ কর বাতিলের যে প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা আর কার্যকর হচ্ছে না। এতে প্রাতিষ্ঠানিক ও করপোরেট বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা দূর হয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর সুবিধার ক্ষেত্রও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও সরাসরি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি পুনরায় গণপ্রস্তাবের (আরপিও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানও এখন কর সুবিধা পাবে। তবে এজন্য পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ছাড়তে হবে। সরকারের আশা, এতে বাজারে মুক্ত শেয়ারের পরিমাণ বাড়বে এবং পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে।
ব্যক্তিগত করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ নির্ধারিত করহার চালু করা হয়েছে। আগে এই আয় মোট করযোগ্য আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রচলিত আয়কর স্তর অনুযায়ী করের আওতায় আসত। নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের করের চাপ কমবে এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থ বিলে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসার ওপর প্রস্তাবিত নির্দিষ্ট মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে।
তিন পার্বত্য জেলা ও সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চাকরিজীবীদের বেতন আয় করমুক্ত করা হয়েছে। এর আগে তাদের ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর ছাড়ের সুবিধা ছিল। এ ছাড়া আমদানি করা চিংড়ির খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ, অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিতে শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিন আমদানির শুল্কও কমানো হয়েছে। প্রস্তাবিত ১০ শতাংশের পরিবর্তে এখন থেকে এ পণ্যের আমদানি শুল্ক হবে ৫ শতাংশ।

