বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করেছে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা)। এই লক্ষ্য সামনে রেখে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহযোগিতায় রাজধানীতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরতে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়াধীন মিডা এবং জাইকা বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিকে বাণিজ্যিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে চারটি সম্ভাবনাময় খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এগুলো হলো গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক চাষাবাদ (ম্যারিকালচার), অ্যাকুয়াকালচার ও চিংড়ি চাষ এবং সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ।
সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা শিল্পভিত্তিক মৎস্য নৌবহর পরিচালনা, অফশোর কার্যক্রম, মাছ খালাস ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিংড়ি মূল্যশৃঙ্খল, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো এবং আধুনিক সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা গড়ে তোলার বিনিয়োগ সুযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। এছাড়া মিডার নির্বাহী সদস্য কমোডর তানজিম ফারুক বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। জাইকার মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. এচিগো মানাবু জাপানের মৎস্যবাজারে বাংলাদেশের সুযোগ এবং বঙ্গোপসাগরে টুনা মাছ আহরণে জাপানের বেসরকারি খাতের আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরেন। এছাড়া মৎস্য অধিদপ্তরের ড. মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী এবং এগ্রোলিংকের সায়েদ ইশতিয়াকও পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের ডেপুটি প্রধান অব মিশন ও মিনিস্টার তাকাহাশি নাওকি। তিনি বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ)’ স্বাক্ষর হয়েছে। এই চুক্তি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি করেছে।
তাকাহাশি নাওকি আরও বলেন, এমন প্রেক্ষাপটে এই সেমিনার অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী খাত নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্যও এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং জাইকা বাংলাদেশ অফিসের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো। তারা উভয়েই এই খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দেন।
সমাপনী বক্তব্যে মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগের পথে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক, অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলো দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জানান, বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বর্তমান নেতৃত্বের সুস্পষ্ট ও আন্তরিক সদিচ্ছা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সেমিনারের পর বেসরকারি উদ্যোক্তা ও উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহপত্রের ভিত্তিতে মিডা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবে। একই সঙ্গে নীতিগত ও আইনি জটিলতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করা হবে।
উল্লেখ্য, ‘মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২৬’-এর আওতায় গঠিত মিডা একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। কক্সবাজারের মহেশখালী ও মাতারবাড়ীর কৌশলগত গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস, জ্বালানি, উৎপাদন শিল্প এবং মৎস্য খাতের সমন্বয়ে এ অঞ্চলকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সংস্থাটি।
আয়োজকদের মতে, এই সেমিনারের মাধ্যমে মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতি খাতে কারিগরি ও কৌশলগত বিনিয়োগ সহজ করার ক্ষেত্রে মিডা ও জাইকার যৌথ সহযোগিতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

