ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে প্রস্তাবিত প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা আর কার্যকর হচ্ছে না। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো বাতিল রেখে আগের বিদ্যমান ভ্যাট ব্যবস্থাই বহাল থাকবে। ফলে এসএমই খাতে বিদ্যমান কর কাঠামো অনুযায়ীই ব্যবসা পরিচালিত হবে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় মাসে আড়াই লাখ টাকা বা বছরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হলে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। একই নিয়ম আগের মতোই বহাল থাকছে। তবে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বা বিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতায় কোনো পরিবর্তন আসছে না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব খোলা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং বিকাশ ও নগদসহ মোবাইল আর্থিক সেবায় মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট চালুর ক্ষেত্রে বিআইএন প্রয়োজন হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার কম টার্নওভার হলে কোনো ভ্যাট দিতে হয় না। ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার হলে ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হয়। এই ব্যবস্থায় জটিল হিসাব বা ইনপুট–আউটপুট ভ্যাট রেকর্ড সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে এই নিয়মে লাভ বা লোকসান যাই হোক না কেন, মোট বিক্রয়ের ওপর নির্ধারিত হারে কর দিতে হয়। পাশাপাশি ক্রয়ের সময় পরিশোধিত ভ্যাট সমন্বয়ের সুযোগও থাকে না। অন্যদিকে, বছরে ৫০ লাখ টাকার বেশি টার্নওভার হলে সাধারণ ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় ১৫ শতাংশ হারে নিবন্ধন ও কর পরিশোধ করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এলাকা, বাজার ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের প্যাকেজ ভ্যাট চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে সেই প্রস্তাব এখন আর কার্যকর হচ্ছে না।
১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের ভ্যাটসংক্রান্ত দলিল, হিসাবের খাতাপত্র সংরক্ষণ করতে হবে না এবং রিটার্ন দাখিলেরও প্রয়োজন হবে না। তাঁর ভাষায়, এতে কর আদায় হবে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়।
তিনি আরও জানান, ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ তৈরি হলে কর প্রদানের পরিধি বাড়বে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হবেন এবং নিজেদের গর্বিত করদাতা হিসেবে দেখতে পাবেন।
বাজেট প্রস্তাবে মোট ১৬টি খাতকে প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে মুদি দোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, প্রসাধন সামগ্রীর দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিক গৃহস্থালি পণ্যের দোকান, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটর, মুঠোফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্ট, আসবাবপত্র, মিষ্টান্ন ভান্ডার ও রেস্তোরাঁ।
তবে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা। তাদের অভিযোগ ছিল, প্যাকেজ ভ্যাট চালু হলে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর হয়রানি বাড়বে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতিও সংবাদ সম্মেলন করে প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
সূত্র জানায়, নতুন সরকার প্রথম বাজেটেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়নি। সেই বিবেচনায় প্যাকেজ ভ্যাট থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভূমিকা রাখেন বলে সূত্রের বরাতে জানা যায়। তবে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা সম্প্রসারণে বাজেটের অন্যান্য উদ্যোগ আগের মতোই বহাল থাকবে।
প্যাকেজ ভ্যাটের ইতিহাস ও পরিবর্তনের ধারা:
বাংলাদেশে ভ্যাট ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। তৎকালীন বিএনপি সরকার এই ব্যবস্থা চালু করে। সেই কাঠামোর আওতায় ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কে ভ্যাট আদায় করা হতো, যা পরবর্তীতে ব্যবসায়ী মহলে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ নামে পরিচিতি পায়।
এ ব্যবস্থায় এলাকাভেদে ভ্যাটের পরিমাণে ভিন্নতা ছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্ধারিত ছিল ১৪ হাজার টাকা। অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ হাজার টাকা। জেলা পৌর এলাকায় ৭ হাজার ২০০ টাকা এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৩ হাজার ৬০০ টাকা প্যাকেজ ভ্যাট দিতে হতো।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থার বিলুপ্তির পথ তৈরি হয়। তবে ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তির কারণে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। পরে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি সাধারণ আদেশের মাধ্যমে প্যাকেজ ভ্যাট পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেয়।
এর পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক বা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব খুলতে বা ঋণ নিতে হলে বিআইএন প্রয়োজন। একইভাবে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়ন, প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ গ্রহণ এবং বিআরটিএ থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন রেজিস্ট্রেশন নিতে হলেও বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

