একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে বলা হতো দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আজও ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো বড় দোকানে শার্ট তুলে নিলে অনেক সময়ই দেখা যায় লেবেলে লেখা— “মেইড ইন বাংলাদেশ”।
চার দশকের বেশি সময় ধরে এই খাত বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৮৪ শতাংশ বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে। সরাসরি কাজ করেন ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক, যাদের বড় অংশই নারী। পাশাপাশি সাব-কন্ট্রাক্টিং ইউনিটেও আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ যুক্ত আছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন একাই বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অংশ প্রায় ১৯ শতাংশ, আর যুক্তরাজ্যের ১১ শতাংশের মতো। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি ১৭ কোটি মানুষের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ২৭৩টি এলইইডি সনদপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে, যা ভিয়েতনাম বা চীনের তুলনায় অনেক বেশি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা, সম্মতি ও টেকসই উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবুও বাস্তবতা হলো—কারখানা বন্ধ হচ্ছে।
কারখানা বন্ধের কঠিন বাস্তবতা:
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১১৩টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এতে কাজ হারান প্রায় ৯৬ হাজার শ্রমিক। একই সময়ে নতুন ১২৮টি কারখানা চালু হলেও সেখানে কর্মসংস্থান হয় ৭৪ হাজারের কিছু বেশি মানুষের। ফলে মোট হিসাবে চাকরি কমে যায় ২২ হাজারের বেশি। এই বন্ধ হওয়ার হার আরও বেড়ে যায় ২০২৪ সালের আগস্টের পর। ওই সময় থেকে একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে থাকে।
২০২৫ সালের আগস্ট নাগাদ আরও অন্তত ৩০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়। এর মধ্যে ছিল এএসটি গার্মেন্টস, মেরকিউরি নিটওয়্যার প্রাইভেট, বে ক্রিয়েশন, কনওয়ে নিটওয়্যার, ডিজনি সোয়েটার ও ফতুল্লা ফেব্রিকসের মতো প্রতিষ্ঠান। মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে অর্ডার কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের পূর্ণ মূল্য দিতে অনীহা। শুধু ২০২৪ সালেই শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক বেতন না পেয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।
একই সময়ে বৈশ্বিক বাজারেও বড় পরিবর্তন আসে। ২০২৫ সালে ভিয়েতনাম আবার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যায়। ভিয়েতনামের রপ্তানি দাঁড়ায় ৩৯.৬৪ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের ছিল ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বছরে বছরে প্রায় ১৯.৩৫ শতাংশ কমে যায়। টানা আট মাস ধরে চলতে থাকে এই পতন। একই সময়ে ভিয়েতনাম ও ভারত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখে।
প্রশ্নটা আরও গভীর। একই বৈশ্বিক চাপের মধ্যে অন্য দেশ এগোচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে পড়ছে? শিল্প নেতারা অবশ্য একাধিক বাস্তব সমস্যার কথা বলছেন—জ্বালানি সংকট, গ্যাস ঘাটতি, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, ইউরোপ–আমেরিকার উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া।
এসব কারণ অবশ্যই সত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। কারণ একই বৈশ্বিক চাপ ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া বা তুরস্কের ওপরও আছে। তবুও তারা তুলনামূলকভাবে ভালো করছে। একজন সাবেক বিজিএমইএ পরিচালক মোহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো বাজারভিত্তিক কৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণে ঘাটতি। অনেক কারখানাই এখনো পুরোনো ধাঁচে চলছে, যেখানে নতুন বাজার ও নতুন ক্রেতার দিকে নজর কম।
গাজীপুর, আশুলিয়া বা নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গেলে দেখা যায়, অনেক মালিক কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভবন, মেশিন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এমনকি চিকিৎসা সুবিধা পর্যন্ত তৈরি করেছেন কিন্তু প্রশ্ন হলো—মার্কেটিংয়ে কতটা বিনিয়োগ হয়েছে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক মেলা, ব্র্যান্ড প্রচার, নতুন ক্রেতা খোঁজা, বা পেশাদার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট টিম—এসব ক্ষেত্রে অনেক কারখানারই তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ব্যবসা দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি এজেন্ট ও পুরোনো ক্রেতার ওপর। এই মডেলে মালিকরা অনেকটা অপেক্ষা করেন—কখন অর্ডার আসবে।
বৈশ্বিক চাহিদা কমলে বড় ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহকারী সংখ্যা কমিয়ে দেয়। তারা তখন এমন কারখানাকে বেছে নেয়, যারা দ্রুত সাড়া দেয়, সম্পর্ক ধরে রাখে এবং নিজেদের পেশাদারভাবে উপস্থাপন করতে পারে। যে কারখানা এসব করতে পারে না, সে বাজার থেকে ধীরে ধীরে বাদ পড়ে যায়।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি “গ্রিন সার্টিফায়েড” গার্মেন্ট কারখানার দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাফল্য কতটা আন্তর্জাতিক ক্রেতারা জানে? শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ নিজের পরিবর্তনের গল্প বিশ্বে যথেষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি। ফলে বড় ব্র্যান্ড ও ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দেশের ইতিবাচক রূপ অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে।
ধরা যাক, একটি কারখানার বার্ষিক সক্ষমতা ২০ মিলিয়ন ডলারের কিন্তু সেটি মাত্র তিনটি ক্রেতার ওপর নির্ভরশীল। যখন একজন বড় ক্রেতা অর্ডার কমিয়ে দেয়, আরেকজন উৎপাদন ভিয়েতনামে সরিয়ে নেয়, তখন কারখানাটি বাধ্য হয়ে কম দামে কাজ নেয়। অর্ডার কমে যায়, উৎপাদন সক্ষমতা নেমে আসে ৫৫ শতাংশে।
ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রমিক বেতন আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় কারখানা। এটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়—এমন ঘটনা বহু কারখানার বাস্তব চিত্র। অর্থনীতিবিদদের মতে, দুই–তিনটি ক্রেতার ওপর নির্ভর করা মানে ব্যবসা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদশা। আর ১০–২০টি বৈচিত্র্যময় ক্রেতা থাকলে সেখানে থাকে স্থিতিশীলতা ও দর-কষাকষির ক্ষমতা।
একটি সহজ সত্য এখানে বারবার ফিরে আসে—যে কারখানার যত বেশি ক্রেতা, সে তত বেশি শক্তিশালী। আর যে কারখানা কয়েকজন ক্রেতার ওপর নির্ভরশীল, তার ভবিষ্যৎ অনেকটাই অন্যের হাতে। এই বাস্তবতা থেকেই উঠে আসে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি এখন শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিজের বাজার তৈরি করতে শিখবে?

