অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বিতর্কিত প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করেছে সরকার। একই সঙ্গে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি, কর্পোরেট কর হ্রাস এবং বিভিন্ন খাতে ভ্যাট ও শুল্ক কমানোর মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত সংশোধনের অংশ হিসেবে এসব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
গতকাল সংসদে সংশোধিত অর্থবিল ২০২৬ পাস হয়। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিলটি পাসের সময় একাধিক নীতি পরিবর্তন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়, যা দেশের কর ও রাজস্ব কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধতার প্রস্তাব প্রত্যাহার:
সংশোধিত অর্থবিলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সম্পত্তি লেনদেনে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি। প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ আয়কর দিয়ে বৈধ করা যাবে। এই সুযোগ কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট লেনদেন নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ ছিল।
এছাড়া প্রস্তাব ছিল, কোনো ক্ষেত্রে আগে থেকে মামলা চলমান থাকলে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর প্রদান করে তা নিষ্পত্তি করা যাবে। প্রস্তাব প্রকাশের পরই এটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক মহল এবং বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে এর স্বচ্ছতা ও নীতিগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
বাজেট আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশে অনেক ক্ষেত্রে জমি প্রকৃত বাজারমূল্যে রেজিস্ট্রেশন হয় না। ফলে নথিতে প্রকৃত মূল্য না থাকায় করদাতারা জটিলতায় পড়েন। এই বাস্তব সমস্যার সমাধান হিসেবেই প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেন, বিষয়টি জনমনে ভিন্ন ধারণা তৈরি করেছে।
জনমতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারও পূর্ববর্তী একটি বিধান বাতিল করেছিল, যেখানে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে অপ্রদর্শিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ ছিল।
কর্পোরেট কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন:
সংশোধিত অর্থবিলে কর্পোরেট খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে করহার কমানো হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, কর ছাড়ের সুবিধা যেন গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানো, ভাষা ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনের সুযোগ বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়।
তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করনীতিতেও শিথিলতা আনা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডিং শর্ত সহজ করা হয়েছে। এখন ন্যূনতম ১০ শতাংশ জনগণের অংশীদারিত্ব থাকলেই ২০ শতাংশ কর সুবিধা পাওয়া যাবে।
যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানির জনসাধারণের অংশীদারিত্ব ১০ শতাংশের নিচে, তাদের করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এই সুবিধা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রযোজ্য হবে। অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া লভ্যাংশ আয়ের ওপর আলাদা কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর যে প্রস্তাব ছিল, তা আর কার্যকর হচ্ছে না।
করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি:
ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৮–২৯ ও ২০২৯–৩০ অর্থবছরে এটি ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হবে। ২০৩০–৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হবে।
এই পরিবর্তনের ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ তুলনামূলকভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কর ছাড় সুবিধা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এখন এটি বেতন আয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠী এই সুবিধার আওতায় থাকবে।
ব্যাংক হিসাব খোলার সময় কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) প্রদানের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে। সরকার বলছে, এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা সহজ করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিধি সম্প্রসারিত হবে।
সংশোধিত অর্থবিলে বিভিন্ন খাতে মূল্য সংযোজন কর ও কর হ্রাস করা হয়েছে। সোনার মূলধনি মুনাফার কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে সংযোজিত পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ভ্যাটও ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া শিল্প ও বাণিজ্য খাতে আমদানি-নির্ভর কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুল্ক কাঠামোতেও একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। হানি আমদানিতে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। পিভিসি ও পিইটি রেজিনে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। কোল্ড রোলড শিট, ফ্ল্যাট-রোলড কোটেড পণ্য এবং তামা আমদানিতে বিভিন্ন শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করা হয়েছে। কাঁচা কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া এলইডি বাতি এবং প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে দেওয়া কর সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সংশোধিত অর্থবিল ২০২৬–এর মাধ্যমে সরকারের করনীতি ও রাজস্ব কাঠামোয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধতার প্রস্তাব প্রত্যাহারকে নীতিগতভাবে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে কর্পোরেট কর হ্রাস, করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে ভ্যাট ও শুল্ক কমানোর ফলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ কিছুটা সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।

