বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে শ্রম অভিবাসনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।
বৈঠকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, দ্রুত শ্রমবাজার চালু করা, অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধতার আওতায় আনা এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও কম ব্যয়বহুল করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন দুই দেশের নেতারা। লক্ষ্য হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে প্রকৃত শ্রমিকদের সুবিধা নিশ্চিত করা।
এ সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে শোষণ, অস্বচ্ছতা এবং মানবিক উদ্বেগের বিষয়গুলো বাস্তব। এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলেও তিনি মত দেন।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে যৌথ কর্মপরিষদের বৈঠক আয়োজন এবং নতুন একটি সমঝোতা স্মারক প্রণয়ন। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো শ্রমিকবান্ধব সংস্কারে পরিণত হয় কি না, তার ওপর।
তবে এখানেই শেষ নয়। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি শুধু নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগকেই সাফল্য হিসেবে দেখবে, নাকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও টেকসই শ্রম অভিবাসনব্যবস্থা গড়ে তুলবে? কারণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অতীত কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনিয়ম, শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের দীর্ঘদিনের প্রভাব।
বাজার খোলার আলোচনার আড়ালে থেকে গেল যে বাস্তবতা:
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবার উন্মুক্ত হওয়া। কয়েকটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত ঘটনা হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়।
এদিকে কয়েকজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যও সেই প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করে। তাঁদের মন্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে হয়ে গেছে এবং কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা চলছে। এতে সম্ভাব্য কর্মী, তাঁদের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়। তবে সফর শেষে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা ভিন্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও টেকসই করার বিষয়ে দুই দেশের নীতিগত ঐকমত্য।
এই ঘটনাপ্রবাহ গণমাধ্যম ও সরকারি যোগাযোগব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল শ্রমবাজার খুলবে কি না—কিন্তু দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট, যেমন সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের বিষয়গুলো খুব কমই গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে অতীতে কেন মালয়েশিয়া একাধিকবার শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করেছে বা কেন বিপুল অর্থ ব্যয় করেও অনেক বাংলাদেশি কর্মী প্রতিশ্রুত চাকরি ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পাননি, সে প্রশ্নও আলোচনায় তেমন স্থান পায়নি।
প্রকৃতপক্ষে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল শুধু শ্রমবাজার খুলছে কি না, তা নয়; বরং কী ধরনের শ্রমবাজার চালু হচ্ছে, কোন শর্তে তা পরিচালিত হবে, শ্রমিকদের কত ব্যয় বহন করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে। এসব বিষয় উপেক্ষা করে কেবল বাজার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকেই সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা নীতিগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। তিনি শ্রমিকদের কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের মানবিক মর্যাদা, অধিকার এবং সুরক্ষার বিষয়েও স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও এই বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রম অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস একটি সফরের মাধ্যমে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। গত এক দশকে এই শ্রমবাজার একাধিকবার বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে। একই সময়ে সীমিত সংখ্যক এজেন্সির নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে। অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করে মালয়েশিয়ায় গেলেও প্রতিশ্রুত কাজ পাননি, কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন, অনিয়মিত অবস্থায় পড়েছেন কিংবা অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
দুঃখজনকভাবে গণমাধ্যমের একটি অংশ বাস্তব চিত্রের চেয়ে শিরোনামনির্ভর উচ্ছ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একইভাবে কিছু সরকারি বক্তব্যও বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দেয়। অথচ দায়িত্বশীল যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সম্ভাবনার পাশাপাশি শর্ত, সীমাবদ্ধতা এবং ঝুঁকির বিষয়গুলোও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। কারণ শ্রমবাজার চালু হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যদি সেটি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও শ্রমিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া হয়, তাহলে তা কেবল অযৌক্তিক প্রত্যাশাকেই আরও শক্তিশালী করবে।
এ কারণেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যখন শ্রমিক শোষণ, অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন, সেটিকে শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার একটি স্পষ্ট স্বীকৃতি। সব মিলিয়ে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা শ্রমবাজার খোলার সম্ভাবনা নয়; বরং এমন একটি শ্রম অভিবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা, যা হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদাকেন্দ্রিক। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়—যে শ্রমবাজার খুলবে, সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান কতটা নিশ্চিত হবে।
শ্রমিকের ঘাম, লাভ কার পকেটে?
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর পুরো ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসছে—এই প্রক্রিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন কে? প্রকৃত শ্রমিক, নাকি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, শ্রম অভিবাসন শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; এটি বড় অঙ্কের অর্থের সঙ্গে জড়িত একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবসাও। যখন নিয়োগপ্রক্রিয়া সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন প্রতিযোগিতা কমে, ব্যয় বাড়ে এবং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে নীতিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক স্বার্থই প্রধান হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিকরা। বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে তাঁদের অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেই অর্থের জোগান দিতে অনেকে ঋণের আশ্রয় নেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর তাঁদের আয়ের বড় অংশ চলে যায় ঋণ পরিশোধে। এতে সঞ্চয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং অভিবাসনের মাধ্যমে আর্থিক উন্নতির যে প্রত্যাশা থাকে, তার বড় অংশই অপূর্ণ থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থাকে কতটা উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক এবং ডিজিটাল করা যায়। কারণ কার্যকর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে শ্রমবাজার আবার চালু হলেও পুরোনো সমস্যাগুলো থেকেই যাবে। তখনও শ্রমিকের পরিবর্তে সীমিত কয়েকটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে এবং দীর্ঘদিনের শোষণের চক্র ভাঙা সম্ভব হবে না।
শ্রমিক পাঠালেই হবে না, নিশ্চিত করতে হবে তাঁদের অধিকার:
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশি শ্রমিকদের শুধু অর্থনৈতিক অবদান রাখার মানুষ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের মানবিক মর্যাদা, অধিকার এবং সুরক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। এই অবস্থান বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশে বিদেশগামী কর্মীদের প্রায়ই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে তাঁদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়টি অনেক সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না। অথচ বর্তমান বিশ্বে শ্রম অভিবাসনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো অধিকারভিত্তিক অভিবাসন, যেখানে শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভিবাসন নীতিতে মূলত কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন এবং কত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এল—এসব সূচকই বেশি আলোচিত হয়েছে। বিপরীতে কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
ভবিষ্যতের যেকোনো শ্রমচুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত শ্রমিকের অধিকার। চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ আবাসনের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট জব্দের নিষেধাজ্ঞা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা ও কার্যকর কনস্যুলার সেবাও নিশ্চিত করতে হবে।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন সমঝোতা স্মারক বা শ্রমচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ আবাসন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য প্রতিরোধ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাস ও শ্রম উইংয়ের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে সংকটে পড়া শ্রমিকেরা সময়মতো বাস্তব সহায়তা পেতে পারেন।
অনিয়মিত শ্রমিকের সংকট, আসল সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই বিষয়কে কেবল মানবিক সহায়তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। বরং এটি বিদ্যমান শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
একজন শ্রমিক বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়ার পরও যদি পরবর্তীতে অনিয়মিত অবস্থায় চলে যান, তাহলে তার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ কাজ করে। নিয়োগপ্রক্রিয়ার ত্রুটি, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন কিংবা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—এসব কারণ অনেক শ্রমিককে আইনি কাঠামোর বাইরে ঠেলে দেয়। তাই বৈধকরণ প্রয়োজনীয় হলেও এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেখানে থেকে গেছেন, কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পড়েছেন।
এসব শ্রমিকের বড় একটি অংশ দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তাঁরা আইনি সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন। ফলে তাঁদের বৈধ মর্যাদা দেওয়া শুধু মানবিক পদক্ষেপ নয়, অর্থনৈতিকভাবেও তা যৌক্তিক। বৈধতা পেলে তাঁরা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় কাজ করতে পারবেন, নিয়মিত কর পরিশোধের সুযোগ পাবেন এবং শোষণের ঝুঁকিও কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও আরও নিয়মিতভাবে রেমিট্যান্স পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তবে বৈধকরণ কর্মসূচিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘমেয়াদে একই সংকট এড়াতে হলে শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। এমন একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নিয়োগকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। অন্যথায় বৈধকরণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আবারও নতুন করে অনিয়মিত শ্রমিক তৈরির একই চক্র শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
দক্ষ কর্মী গড়তে না পারলে টেকসই হবে না শ্রমবাজার:
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ পেশায় কাজ করছেন। এর ফলে তাঁদের আয় তুলনামূলক কম থাকে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়তে হয়। এদিকে মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক উৎপাদন, নির্মাণ ও বিশেষায়িত সেবা খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন কৌশলেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
শুধু বিদেশে বেশি সংখ্যক শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলে চলবে না। বরং এমন কর্মী তৈরি করতে হবে, যাঁরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম। সে জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারণ একজন দক্ষ কর্মী শুধু বেশি আয়ই করেন না, তিনি তুলনামূলক কম ঝুঁকির মধ্যে থাকেন এবং দেশের জন্যও বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ তৈরি করেন। তাই ভবিষ্যতের অভিবাসননীতিতে দক্ষতা উন্নয়নকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নতুন সমঝোতা স্মারক, বাস্তব পরিবর্তনের পরীক্ষাও:
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, কেবল কাগজে চুক্তি স্বাক্ষর করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না; সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর বাস্তবায়ন।
এ কারণে নতুন চুক্তিতে শ্রমিক নিয়োগের প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা, নিয়োগ ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, দুই দেশের যৌথ তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে নাগরিক সমাজ, শ্রম অধিকারবিষয়ক সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
এই সমঝোতা স্মারককে শুধু একটি প্রশাসনিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এর সফলতা নির্ধারিত হবে কতজন শ্রমিক বিদেশে গেলেন, সেই সংখ্যায় নয়; বরং তাঁদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হলো, অভিবাসনের ব্যয় কতটা কমল এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত হলো—এসব সূচকের ভিত্তিতে।
সবশেষে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যাকেই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর পরিবর্তে শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা এবং কল্যাণকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং শ্রমিক সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ায় ইতিবাচক বার্তা মিলেছে। তবে এসব উদ্যোগ যদি বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ না নেয়, তাহলে এই অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
নতুন সমঝোতা স্মারক যদি নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমায়, শ্রমিকের অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষার কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে এটি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় অতীতের সমস্যাগুলোই নতুন রূপে আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।

