নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছর শুরু হয়েছে আজ বুধবার থেকে। এর সঙ্গে কার্যকর হয়েছে নতুন জাতীয় বাজেটও। এখন থেকে সরকারের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব চলবে এই বাজেটের ভিত্তিতে। প্রতি বছরের মতো এবারও বাজেটে কোথাও কর ও শুল্কে ছাড় দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নতুন কর আরোপ কিংবা বিদ্যমান নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাজেট ঘোষণার পর থেকেই সাধারণ মানুষ ও করদাতাদের বড় প্রশ্ন থাকে—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটা বাড়বে বা কমবে, ব্যক্তিগত ব্যয় কতটা পরিবর্তিত হবে এবং কর ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়বে। বাজেট পাসের আগে শেষ মুহূর্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সংশোধন ও প্রত্যাহারও করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকরের পর সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত পরিবার ও করদাতাদের জন্য কী কী পরিবর্তন এসেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো।
চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত:
এবারের বাজেটে করদাতাদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি। আগে বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত ছিল। বাজেটে সেটি প্রথমে পৌনে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও পরে অর্থবিল পাসের সময় তা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে।
ফলে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কারও বার্ষিক আয় চার লাখ টাকার কম হলে তাঁকে আয়কর দিতে হবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ায় করদাতাদের ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে। এ ছাড়া করমুক্ত সীমার পরের প্রথম এক লাখ টাকার ওপর আগে যে ৫ শতাংশ কর দিতে হতো, সেই স্তরটি তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা কর বহাল রাখা হয়েছে।
সারা বছর আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে:
এখন থেকে নির্দিষ্ট সময়ের পরিবর্তে পুরো বছরজুড়েই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে কোন সময়ে রিটার্ন দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করবে কর ছাড় বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের বিষয়টি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে অতিরিক্ত কোনো ছাড় বা জরিমানা থাকবে না।
জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা তিন হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত দিতে হবে। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা পাঁচ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই অর্থ অতিরিক্ত দিতে হবে। গত বছরের মতো এবারও পাঁচ শ্রেণির করদাতা ছাড়া সবাইকে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। এর ফলে শেষ সময়ের চাপ কমবে এবং বছরের যেকোনো সময় রিটার্ন দেওয়া সম্ভব হবে। অনলাইন ব্যবস্থায় কর ছাড় ও জরিমানার হিসাবও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে। এতে করদাতাদের হয়রানি কমবে।
নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা ১০ শতাংশ অগ্রিম করকে আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হবে না। অর্থবছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে এই কর সমন্বয় করা যাবে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর কাটা হলে তা ফেরত পাওয়া যাবে। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট করদাতাকে টিআইএন নিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং রিটার্নে ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ করে কর ফেরতের আবেদন করতে হবে। যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে প্রাপ্য অর্থ ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়া হবে।
এর ফলে যাঁদের করযোগ্য আয় নেই কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর কেটে রাখা হয়েছে, তাঁরা আগামী বছর থেকে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রসহ তিন ধরনের সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ কর কাটা হয়। নতুন বাজেটে এ হার ৫ শতাংশ থাকবে নাকি ১০ শতাংশ হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
নতুন বাজেটে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের সুবিধা আগের তুলনায় কমানো হয়েছে। আগে মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা কর রেয়াত পাওয়া যেত। এখন মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ পর্যন্ত হিসাব করা হবে এবং সর্বোচ্চ রেয়াত হবে সাড়ে সাত লাখ টাকা। এ ছাড়া করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ সাড়ে সাত লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হবে, সেটিই কর রেয়াত হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে উচ্চ আয়ের করদাতারা আগের তুলনায় কম কর রেয়াত পাবেন। উদাহরণ হিসেবে, বছরে তিন কোটি টাকা করযোগ্য আয় এবং এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে আগের তুলনায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা কম কর রেয়াত মিলবে।
আগে ব্যাংক হিসাবে তিন লাখ টাকা জমা থাকলেই বছরে একবার আবগারি শুল্ক দিতে হতো। নতুন বাজেটে এই সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। এখন কোনো ব্যাংক হিসাবে বছরে একবার চার লাখ টাকা বা তার বেশি স্থিতি থাকলেই কেবল আবগারি শুল্ক কাটা হবে। একটি ঋণ হিসাবের বিপরীতে মাত্র একবার আবগারি শুল্ক আদায় করা হবে। এতে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
স্বাস্থ্য খাতে এবার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর ছাড় ও সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য এককালীন সরকারি ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে। হার্টের রিং আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করায় প্রতিটি রিংয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।
কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ডায়ালাইসিসের খরচ রোগীপ্রতি প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এ ছাড়া হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেট আমদানির অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে।
মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ ও ব্যাংকঋণ সুবিধা চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধসংক্রান্ত তথ্য সহজে পাওয়া যাবে।
আগে ৩৯ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা নিতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতো। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪১। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে হলেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে।
এ ছাড়া নিবাসী করদাতা কোনো কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হতে হলেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে অনিবাসী পরিচালক ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের নামজারি এবং বণ্টনের ক্ষেত্রে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বর্তমানে ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিভিন্ন পেশাজীবী সংস্থার সদস্যপদ নবায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয়, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন, কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন হল ভাড়া নেওয়াসহ মোট ৪১ ধরনের সেবা গ্রহণে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে।
নতুন বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এক নজরে:
- বার্ষিক চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত।
- সারা বছর অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে।
- সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা অতিরিক্ত কর রিটার্নের মাধ্যমে ফেরত পাওয়া যাবে।
- ব্যাংক হিসাবে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক দিতে হবে না।
- ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে।
- চিকিৎসা খাতে বিভিন্ন কর ছাড় ও রোগীদের জন্য বাড়তি সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
- আয়কর রিটার্ন ছাড়া পাওয়া যাবে না এমন সরকারি ও বেসরকারি সেবার সংখ্যা বেড়ে ৪১ হয়েছে।

