বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছে সুকুক বা ইসলামী বন্ড। সুদভিত্তিক প্রচলিত বন্ডের বিকল্প হিসেবে শরিয়াহসম্মত এই অর্থায়ন ব্যবস্থা এখন শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নয়, ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও ক্রমশ বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
দেশের বিভিন্ন বৃহৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ সংগ্রহের জন্য সরকার সুকুকের ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা এবং সামাজিক খাতের বড় প্রকল্পে অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে সুকুককে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকও এই শরিয়াহসম্মত আর্থিক উপকরণের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ইসলামিক ব্যাংকিং খাতের পরিধি দ্রুত বাড়লেও শরিয়াহভিত্তিক নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। এ পরিস্থিতিতে সুকুকের বাজার আরও বিস্তৃত হলে ইসলামিক ব্যাংক এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আরও বেশি সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বিকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রও আরও শক্তিশালী হবে।
সুকুক কী, কীভাবে কাজ করে?
সুকুক একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ সনদ বা সার্টিফিকেট। এটি এমন একটি শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন ব্যবস্থা, যেখানে বিনিয়োগকারীরা সুদ গ্রহণ করেন না। এর পরিবর্তে তারা নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প বা সম্পদের অংশীদার হন এবং সেই সম্পদ থেকে অর্জিত আয় বা মুনাফার অংশ লাভ করেন।
সহজভাবে বলতে গেলে, প্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগকারী সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণদাতার ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু সুকুকে বিনিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বা সম্পদের অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে তাদের আয় নির্ভর করে সেই সম্পদ বা প্রকল্প থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর।
প্রচলিত বন্ডের সঙ্গে সুকুকের পার্থক্য:
অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্য একই হলেও প্রচলিত বন্ড ও সুকুকের কাঠামোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগকারীদের একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ দেওয়া হয়। প্রকল্প থেকে লাভ হোক বা না হোক, বন্ডধারীরা পূর্বনির্ধারিত সুদ পেয়ে থাকেন।
অন্যদিকে সুকুকে সুদের কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে প্রকল্প বা সম্পদ থেকে যে আয় হয়, তার ভিত্তিতেই বিনিয়োগকারীদের মুনাফা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় অর্থায়ন সরাসরি বাস্তব সম্পদ বা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে শুধু মুসলিমপ্রধান দেশই নয়, আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে যুক্তরাজ্য, হংকং, সিঙ্গাপুর ও লুক্সেমবার্গের মতো দেশ সুকুক ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশে কেন বাড়ছে সুকুকের গুরুত্ব?
দেশে ইসলামিক ব্যাংকিং খাতের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি ব্যাংক সম্পূর্ণভাবে অথবা আংশিকভাবে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শরিয়াহসম্মত তহবিল থাকলেও নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সুকুক চালু করেছে। এর মাধ্যমে একদিকে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ইসলামিক ব্যাংকগুলো তাদের তহবিল নিরাপদভাবে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়কে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও সুকুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কোন কোন খাতে ব্যবহার হচ্ছে সুকুকের অর্থ?
সরকার ইতোমধ্যে একাধিক সরকারি সুকুক ইস্যু করেছে। এসব সুকুক থেকে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি।
প্রকল্পভিত্তিক এই অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিনিয়োগকারীরা সহজেই জানতে পারেন তাদের বিনিয়োগ করা অর্থ কোন প্রকল্পে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কারা সুকুকে বিনিয়োগ করতে পারেন?
সুকুকে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ইস্যুর ধরন অনুযায়ী সাধারণ ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও।
বিনিয়োগকারীরা কী সুবিধা পান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুকুকে বিনিয়োগের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত একটি বিনিয়োগ মাধ্যম। সরকারি সুকুক তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগও পান, কারণ তাদের বিনিয়োগ নির্দিষ্ট প্রকল্প বা সম্পদের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
সরকারের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সুকুক সরকারের জন্যও কার্যকর অর্থায়নের একটি বিকল্প ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে থাকা অতিরিক্ত বা অলস তারল্য উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি করা যায়। এছাড়া দেশের ইসলামিক পুঁজিবাজার সম্প্রসারণেও সুকুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের জন্য করপোরেট সুকুকের পরিধি বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হলেও সুকুকের বিস্তারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেকেন্ডারি মার্কেট এখনও পর্যাপ্ত সক্রিয় নয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুকুক সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। করপোরেট সুকুকের বাজারও এখনও সীমিত পরিসরে রয়েছে। পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা এবং বাজারের অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বৈশ্বিক বাজারে সুকুকের অবস্থান
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ইসলামিক অর্থায়ন শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সুকুক। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, কাতার এবং বাহরাইন নিয়মিত সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও গ্রিন সুকুকের ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
সামনের দিনে কতটা সম্ভাবনাময় সুকুক?
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে আসতে পারে। এমন বাস্তবতায় দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎসের গুরুত্ব আরও বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে সুকুককে সম্ভাবনাময় একটি বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সরকারি সুকুক ইস্যুর পাশাপাশি করপোরেট সুকুকের পরিধি বাড়ানো, কার্যকর সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের ইসলামিক পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে।
তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সুকুক শুধু উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করবে না, বরং অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

