নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় সংসদ। আজ বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এই বাজেটকে শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগামী এক বছরে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বাজেটের প্রভাব পড়বে সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর। চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তাসহ প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় ও আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে বাজেটের নানা সিদ্ধান্ত সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই এখন মানুষের প্রধান কৌতূহল—নতুন বাজেটে তাদের জন্য কী রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমার কোনো বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে কি না, আয় বাড়ানোর পথ কতটা প্রসারিত হবে, নাকি সংসারের ব্যয়ের চাপ আরও বেড়ে যাবে—এসব প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
সরকারের দাবি, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ভোগান্তি কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনা, আর্থিক খাতে মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। তাদের ভাষ্য, পরিকল্পনা যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, সেটি বাস্তবে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে না পারলে বাজেটের প্রত্যাশিত সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে না।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি কোথায়?
নতুন বাজেটে সাধারণ করদাতাদের জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো। আগে যেখানে বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত ছিল, এখন সেই সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক মানুষের করের বোঝা কিছুটা কমবে।
করসংক্রান্ত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এসেছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে আর টিআইএন বাধ্যতামূলক থাকছে না। একই সঙ্গে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং নামজারির ক্ষেত্রেও টিআইএন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়েই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগও এবার বাতিল করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপ কর ব্যবস্থায় সমতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
বাজারে স্বস্তি মিলবে, নাকি বাড়বে ব্যয়?
নতুন বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিত্যপণ্যের বাজারকে ঘিরে। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। সরকার আগামী এক বছরে সেটি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ, বাজার তদারকি আরও জোরদার করা, পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মাছসহ কয়েকটি খাতে ভ্যাট প্রত্যাহার।
সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কিছু পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় কমবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাস্তবে কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি পরিস্থিতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতার ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বাজেটের প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমে আসতে পারে।
মানুষের আয় বাড়বে কি?
নতুন বাজেটে সবার জন্য সরাসরি আয় বৃদ্ধির ঘোষণা নেই। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এই খাতের কয়েক লাখ পরিবারের আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে দেশের বড় একটি কর্মজীবী জনগোষ্ঠী বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পের পরিসর বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কৃষক, শ্রমিক, তরুণ এবং প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করাই সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য। সরকারের মতে, সরাসরি ভর্তুকির ওপর নির্ভর না করে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমেই মানুষের আয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
কোন খাতগুলো পেল সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব?
এবারের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে অর্থ বিভাগ। এর পর রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, পরিকল্পনা বিভাগ, খাদ্য, সমাজকল্যাণ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়।
উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। সরকারের প্রত্যাশা, এই ব্যয় অবকাঠামো উন্নয়নের গতি বাড়াবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকার কৃষিকে উৎপাদনশীল খাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রফতানিমুখী শিল্প এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ও স্টার্টআপের জন্য সহায়তা, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রবাসী উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।
কর ও ব্যবসায় কী পরিবর্তন এলো?
নতুন বাজেটে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং প্রকৌশল কলেজের ওপর করহার কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ভ্যাট হ্রাস এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে কর ব্যবস্থায় জবাবদিহি বাড়াতে ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ঋণ গ্রহণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক লেনদেনে এখন বিআইএন ব্যবহার করতে হবে। সরকারের মতে, এতে কর প্রশাসনে আরও স্বচ্ছতা আসবে।
বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বাজেটের আকার বড় হলেও তা বাস্তবায়নের পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে আসায় এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু তাৎক্ষণিক স্বস্তির উদ্যোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাদের মতে, বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার, ডিজিটাল খাতে ভ্যাট কমানো এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস—এসব সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব না হলে এসব উদ্যোগের সুফল অনেকটাই সীমিত থেকে যেতে পারে।
গত দুই বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ফলে এবারের বাজেট ঘিরে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেটি বাস্তবে অর্জন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বাজারে কারসাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ দ্রুত কমানো কঠিন হবে।
করছাড়ের চেয়ে কর্মসংস্থানই আয় বাড়ানোর মূল পথ:
অর্থনীতিবিদদের মতে, করছাড় সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে মানুষের আর্থিক অবস্থার স্থায়ী উন্নতির জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি।
তাদের পর্যবেক্ষণ, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশের আয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি খাত, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় বাড়াতে হলে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিল্পায়নের গতি বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া কার্যকর বিকল্প নেই। মানুষের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা হলো একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান। সে কারণে বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ থাকলেও এর সফল বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।
তার ভাষ্য, নতুন অর্থবছরে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশপাশে থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা কাগজে-কলমে অস্বাভাবিক মনে না হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের হিসাব বিবেচনায় নিলে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্য পূরণে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। তার মতে, এই বড় ব্যবধানই বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় দুর্বলতা এবং সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে তিনি অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, বিশ্বের অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে না। তারা বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করে সেখান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। বাংলাদেশকেও ধীরে ধীরে সেই পথ অনুসরণ করা উচিত।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও জানান, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এ খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, পুরো অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে ব্যয় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
তার মতে, শুধু উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো, রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা উন্নত করা এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষি খাতে বড় বরাদ্দ রাখা সরকারের ইতিবাচক নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন। তবে তাদের মতে, কেবল ভাতা বা আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করলেই মানবিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হয় না। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনমান উন্নত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে সরকার মানুষের তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ কমানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিলেও ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ ও সক্ষম মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারত। দেশের ব্যাংক ঋণের বড় একটি অংশ এখনও সীমিতসংখ্যক বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। অথচ সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। এই বৈষম্য দূর করা না গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে বলে তারা মনে করেন।
বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস এখনও ভ্যাট এবং অন্যান্য পরোক্ষ কর। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি করের চাপ পড়ে। একটি আরও ন্যায্য ও প্রগতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে উচ্চ আয় ও উচ্চ সম্পদের ওপর কর আদায় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তারা।
নতুন বাজেটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলেই সাধারণ মানুষ প্রকৃত সুফল পাবে। বাজেটে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে ইতিবাচক দিকের অভাব নেই। কিন্তু বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা, নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতে মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটের সবচেয়ে বড় বার্তা কী?
নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে করের চাপ কিছুটা কমানো, বিনিয়োগের গতি বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করা।
তবে এই লক্ষ্যগুলো কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে বাজেটের প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করবে মূলত তিনটি বিষয়ে। প্রথমত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে। দ্বিতীয়ত, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা বাড়ে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকার কতটা সফল হয়।
সব দিক বিবেচনায় সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এতে কর ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি, বিনিয়োগে উৎসাহ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে বড় বরাদ্দ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অঙ্গীকার রয়েছে।
এসব ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর বাস্তব প্রভাব মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হবে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমা, মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আসার মধ্য দিয়েই সাধারণ মানুষ নতুন বাজেটের প্রকৃত সুফল অনুভব করবে।
এখন তাই সবার নজর বাজেটের ঘোষণার দিকে নয়, বরং তার বাস্তবায়নের দিকে। কারণ, ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায় এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত নতুন বাজেটের সফলতার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত বাজেটের সাফল্য কাগজে লেখা অঙ্কে নয়, মানুষের জীবনের বাস্তব পরিবর্তনেই মাপা হবে। এখন প্রশ্ন একটাই—কয়েক মাস পর বাজারে গেলে মানুষ কি সত্যিই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে, নাকি বাজেটের প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

