বন্ধ ও লোকসানে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় সচল করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করেছে সরকার। এসব কারখানা পরিচালনায় পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা কিংবা সরাসরি বিক্রির মতো একাধিক মডেল বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এর জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
গত ২০ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্প, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। এতে দেশের শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি ব্যবসায়ী ও শিল্পনেতারাও অংশ নেন। বিষয়টি নিয়ে বিডার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তথ্য জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সভায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পকারখানার জন্য ঋণ সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণের সুদহার বা ব্যয় কমানোর অনুরোধ করেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সুদহার কমানোর প্রস্তাব পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি বন্ধ বা দীর্ঘদিন লোকসানি কারখানার অবস্থান, জমির পরিমাণ, বিদ্যমান অবকাঠামো, বন্দর থেকে দূরত্ব, যোগাযোগ সুবিধা এবং সম্প্রসারণ সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটিও কাজ শুরু করেছে। এই কমিটির দায়িত্ব হলো বন্ধ ও সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে সেগুলো পুনরুজ্জীবনের জন্য কার্যকর প্রস্তাব তৈরি করা।
জানা গেছে, এসব শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে গ্যাস সংযোগ, নীতিগত সহায়তা এবং স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধার মতো প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক প্রস্তাবও আহ্বান করা হয়েছে।
৪৪টি বন্ধ ও লোকসানি কারখানার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) ৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন প্রায় ৫টি প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ কারখানার জমি ইতোমধ্যে উন্নত করা হয়েছে এবং সেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো রয়েছে। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা বড় ধরনের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। এ কারণে এসব শিল্প ইউনিট বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের আমিন জুট মিলসসহ কয়েকটি পাটকল, চিনিকল, টেক্সটাইল মিল এবং রাসায়নিক শিল্প ইউনিটের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জমির পরিমাণ কয়েক একর থেকে কয়েকশ একর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে আমিন জুট মিলসের প্রায় ৮০ থেকে ১৫০ একর জমি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সেখানে একাধিক মিলও রয়েছে।
তবে ৪৪টি কারখানার পূর্ণাঙ্গ তালিকা, জমির পরিমাণ ও সম্পদের বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিডা সূত্র জানায়, আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রস্তাব জমা দিলে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অলস পড়ে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আন্তরিকভাবে এসব কারখানা চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন। সরকার বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতি সহায়তা, ঋণ সুবিধা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ করছে।

