অর্থ বিল ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে সরকার নতুন অর্থবছরে প্রবেশ করেছে। এই বিল পাসের সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু কর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছেন। আগে যেসব কর প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনা ছিল, সেগুলোতেই মূলত পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতীতে এ ধরনের অর্থ বিল পাসের সময়ও কর প্রস্তাবে কিছু না কিছু সংশোধন আনার প্রবণতা দেখা গেছে।
করমুক্ত আয়সীমা এবার কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, যা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সীমা আরও বাড়ানোর দাবি ছিল। পাশাপাশি পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে করমুক্ত আয়সীমা নিয়ে আগাম প্রক্ষেপণের কথাও বলা হয়েছে, যাতে করদাতারা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।
এবারের অর্থ বিলে ন্যূনতম করহার দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্তও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে সামনে এসেছে। এতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই প্রভাব কতটা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতির ওপর। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে দুই অঙ্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের বড় অঙ্গীকারের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম। নির্বাচনী ইশতেহারেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। কিন্তু বাস্তবতায় তরুণদের বড় একটি অংশ এখনো বেকার। যারা কর্মে যুক্ত আছেন, তাদের অনেকের আয়ও প্রত্যাশার তুলনায় কম।
বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরাও আগের মতো আয় করতে পারছেন না বলে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এই অবস্থায় দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সহজ হবে।
বাজেটে বিনিয়োগের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করার চেষ্টা দেখা গেছে। এক অর্থবছরে এসব পরিবর্তন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হলেও সরকারের নীতিগত অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তার ঘোষণাও উদ্যোক্তাদের কিছুটা আশ্বস্ত করেছে।
এছাড়া স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় কিছু কর ছাড়ও অর্থ বিলে যুক্ত হয়েছে। বিশেষভাবে সিগারেটের উপকরণে আরোপিত শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট খাতকে অতিরিক্ত চাপ থেকে কিছুটা রক্ষা করা। তবে এতে রাজস্ব আহরণে প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব বাড়াতে সরকারের এমন কিছু সমঝোতামূলক পদক্ষেপ নিতে হয়।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য এবার রাজস্ব আহরণের ওপর নির্ভরতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি। অথচ বিদায়ী অর্থবছরে সংস্থাটি ৪ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে পেরেছে। সেই হিসাবে নতুন অর্থবছরে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের চাপ তৈরি হয়েছে, যা বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কর ছাড়ের কারণে রাজস্ব কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় আছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করের আওতায় আনার যে পরিকল্পনা ছিল, তা থেকে সরকার কিছুটা সরে এসেছে। ফলে প্রত্যাশিত অতিরিক্ত আয়ের পথও সীমিত হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা বাড়বে এবং সেখান থেকে কতটা অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। এই সময়ে বেসরকারি খাতকে দেওয়া সুবিধার সুফল পুরোপুরি পেতে দেরি হবে।
কর কাঠামোকে সহনীয় করার চেষ্টা স্পষ্ট হলেও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য শুধু করছাড় যথেষ্ট নয় বলে অর্থনীতিবিদদের মত। তাদের মতে, সুদের হার নিয়ন্ত্রণে আনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি শর্ত। সম্প্রতি জ্বালানির দাম নতুন করে বেড়েছে, যার পেছনে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ব্যবসা পরিবেশের একটি বড় উপাদান হিসেবে সামনে এসেছে। এটি সরাসরি বাজেটের বিষয় না হলেও বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট। অন্তর্বর্তী শাসনামলে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার কারণে বিদ্যমান শিল্প সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হয়নি বলেও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর ফলে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং শিল্প খাতে স্থবিরতা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। ব্যাংক খাতের বড় একটি অংশ এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। অর্থ বিল পাসের সময় ব্যাংক খাতে নগদ অর্থ ফেরাতে একটি নতুন উদ্যোগের কথা সামনে আসে। সেখানে সুদ ছাড়া মূল অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের ‘এক্সিট’ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আলোচনা রয়েছে।
এই উদ্যোগে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা গেলেও নতুন করে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা কতটা স্বস্তিতে বিনিয়োগে ফিরতে পারবেন, সেটি এখনো অনিশ্চিত। বিনিয়োগ পরিবেশ পুরোপুরি স্থিতিশীল না হলে এই সম্ভাবনাও সীমিত থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

