জাতীয় সংসদে গত ৩০ জুন চলতি অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন পেয়েছে। বাজেট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, বিরোধী দলের আপত্তি এবং বিভিন্ন মহলের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিলে থাকা বিতর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে।
এসব পরিবর্তনের ফলে এবারের বাজেট একদিকে আগের নীতিগত ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে, অন্যদিকে জনমতকে গুরুত্ব দেওয়ারও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। তাই এই বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দলিল হিসেবেই নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
কী পরিবর্তন হলো, কী অপরিবর্তিত থাকল
বাজেট পাস হওয়ার পর সাধারণভাবে অনেকের ধারণা হয় যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে কাটছাঁট করা হয়েছে। তবে সরকারি নথি এবং সংসদের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এবারের বাজেটে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল, অনুমোদনের সময়ও সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। একইভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকারেও কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
সংসদে ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের ৪৩ জন সদস্য মোট ১ হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করা হয়। ফলে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে নতুন করে কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হয়নি।
বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ বা কাঠামোর পরিবর্তনের চেয়ে নীতিগত সংশোধনই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় পরিকল্পনা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও অর্থ বিলে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন করনীতি ও প্রশাসনিক প্রস্তাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অর্থ বিল পাসের আগে সংসদে ৬৪টি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়।
জনমতের প্রতিফলন দেখা গেল অর্থ বিলে:
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া অর্থ বিলে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, যা সরকারের নীতিগত অবস্থানে নমনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব সংশোধনের মাধ্যমে জনমত ও সংসদীয় আলোচনার প্রতিফলনও স্পষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো, জমি বা সম্পদে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এ প্রস্তাবকে ঘিরে জনমনে বিভ্রান্তি এবং ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হওয়ায় জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে এটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত থেকেও সরকার সরে এসেছে। সংসদে এ নিয়ে আলোচনার সময় সাধারণ মানুষের সম্ভাব্য ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরা হলে সরকার আগের অবস্থান পরিবর্তন করে।
একইভাবে জমির বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধানও বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকেও জনবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংসদীয় আলোচনার পর নেওয়া এই সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি করেছে। এসব সংশোধন থেকে বোঝা যায়, করনীতি ও প্রশাসনিক বিধানে সরকার নমনীয়তা দেখালেও সামগ্রিক ব্যয় পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনেনি।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে পরিবর্তন নেই:
চলতি বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এ খাতে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় বাজেট অনুমোদনের শেষ পর্যায়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমানো হলে পুরো ব্যয় পরিকল্পনা, উন্নয়ন কর্মসূচি এবং অর্থায়নের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সে কারণে সরকার ব্যয়ের কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে শুধু নীতিগত সংশোধনের পথ অনুসরণ করেছে।
যেসব খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ:
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে অর্থ বিভাগ। এর পর রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়।
এই বরাদ্দ কাঠামো থেকে বোঝা যায়, আগামী অর্থবছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং কৃষি খাতকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিশেষ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ অন্যান্য বড় মন্ত্রণালয়ের তুলনায় কম রয়েছে। যদিও শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায় না, তারপরও বরাদ্দের আকার বিবেচনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের তুলনায় জ্বালানি খাত অপেক্ষাকৃত সীমিত অবস্থানে রয়েছে।
ঘাটতি, রাজস্ব ও বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ:
এবারের বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
একই সময়ে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং আয়কর থেকে রাজস্ব বাড়ানোর ওপর সরকারের প্রত্যাশা অনেক বেশি।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। ফলে উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়ন এবং উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ—এই দুটি ক্ষেত্রেই আগামী অর্থবছরে বিএনপি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

