বাংলাদেশে শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত স্থবিরতায় আটকে থাকা প্রকল্পগুলো এবার বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং বাগেরহাটের মোংলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই দুই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নতুন গতি এনেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। পাশাপাশি শিল্প খাতে সম্প্রসারণের মাধ্যমে বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে প্রায় এক লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ফলে এই দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু শিল্পাঞ্চলেই নয়, এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতির বিভিন্ন সহায়ক খাতেও। পরিবহন, নির্মাণ, আবাসন, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং, বীমা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পণ্য পরিবহন সেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতেও কয়েক লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও শিল্প খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে প্রয়োজনীয় হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এই বাস্তবতায় আনোয়ারা ও মোংলার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেবল একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এক দশকের অপেক্ষার পর মিলল গতি:
বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সূচনা হয় ২০১৪ সালে। এরপর ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। একই সময় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও শুরু হয়।
তবে শুরুতেই আশার আলো দেখা গেলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়নের ব্যবস্থা, নকশা সংশোধন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটি প্রায় এক দশক ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি। শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) দেওয়ার আলোচনা ছিল। পরে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়।
বর্তমান সরকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় দীর্ঘদিন স্থবির থাকা এই প্রকল্প আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত অর্থের মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেবে চীন সরকার। অবশিষ্ট অর্থের জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার।
আনোয়ারায় শিল্পায়নের সঙ্গে এক লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য:
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের নিকটবর্তী হওয়ায় এলাকাটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই শিল্পাঞ্চলে বস্ত্র, তৈরি পোশাক, ওষুধ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, মোবাইল ফোন, জুতা, বৈদ্যুতিক পণ্য, ক্রীড়া সামগ্রী, মেডিক্যাল ডিভাইস এবং রাসায়নিক শিল্পসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী কারখানা স্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য বলছে, প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে অন্তত এক লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ, ট্রাক ও কনটেইনার পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং, বীমা, খাদ্য সরবরাহ, আবাসন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সহায়ক খাতে আরও কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এটি অন্যতম বৃহৎ শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত হবে।
চট্টগ্রামের পাশাপাশি বাগেরহাটের মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেইজিংয়ে আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনারে মোংলা বন্দরের পাশে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) এই অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং আধুনিক পণ্য পরিবহন কেন্দ্র নির্মাণে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে রফতানি কার্যক্রম, কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা, গুদামজাতকরণ এবং পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে প্রায় এক লাখ এবং মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে এই দুটি প্রকল্প থেকেই প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে গড়ে ওঠা পরিবহন, সরবরাহ, সেবা ও অন্যান্য সহায়ক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হলে প্রকৃত কর্মসংস্থানের পরিধি আরও অনেক বড় হবে।
৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আগ্রহ:
চীন সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব সামনে এসেছে। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাস অনুসন্ধান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্মার্ট মিটার, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, বস্ত্রশিল্প, লিথিয়াম ব্যাটারি, রেলওয়ের যন্ত্রাংশ উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষা, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভেষজ শিল্পসহ ১১টি বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এদিকে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটি চালু হলে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রতিষ্ঠানটির মিরসরাইয়ের কারখানায় বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কর্মরত রয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে চীনের অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, সমুদ্রবন্দর সুবিধা এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।
চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারও বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চীন অফিস, বিশেষ ‘চায়না রিলেশনশিপ ডেস্ক’ এবং চীনা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের আগ্রহ বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরই শেষ কথা নয়। অতীতে ঘোষিত অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে। ফলে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করা যায় এবং বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
তাদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, প্রশাসনিক অনুমোদনের গতি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে প্রায় এক দশক ধরে বিলম্বিত আনোয়ারা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা এবার দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন।
অর্থনীতির জন্য কেন তাৎপর্যপূর্ণ:
বাংলাদেশের সামনে অন্যতম বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে অনেকেই বেকারত্ব বা স্বল্প আয়ের কর্মসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আনোয়ারা ও মোংলার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে শুধু দুটি শিল্প প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এগুলো দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘোষিত বিনিয়োগগুলো বাস্তবে রূপ পেলে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী শিল্পাঞ্চলগুলোর উন্নয়ন সম্পন্ন হলে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আরও কয়েক লাখ মানুষের পরোক্ষ জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

