চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কর্ণফুলী টানেল এখন প্রত্যাশিত যানবাহন না পাওয়ায় আর্থিক চাপে পড়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোল বাড়িয়েও এই ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮ হাজার ৩৫০টি যানবাহন টানেল ব্যবহার করার কথা থাকলেও বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র প্রায় ৪ হাজার যানবাহন। এটি পূর্বাভাসের মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। এই কম ব্যবহারের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে টানেলটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই চাপে রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টোল বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, টোল ১০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ২০০ টাকা করলে চাহিদার স্থিতিস্থাপকতা দাঁড়ায় মাইনাস ২.৮২। আবার টোল ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করা হলে এই মান হয় ৪.৮৩। যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বব্যাপী মান অনুযায়ী ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে চাহিদার স্থিতিস্থাপকতা সাধারণত মাইনাস ০.৩ থেকে মাইনাস ০.৬ এবং ট্রাকের ক্ষেত্রে মাইনাস ০.১ থেকে মাইনাস ০.৪-এর মধ্যে থাকে। কিন্তু কর্ণফুলী টানেলকে লাভজনক করতে যে মাত্রার পরিবর্তন দরকার, তা এই মানের তুলনায় বহু গুণ বেশি, যা বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্যবাহী ট্রাকচালকেরা বিকল্প সড়ক ব্যবস্থার কারণে টানেল ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। ফলে শুধু টোল সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার টোল কাঠামো থাকলেও কম ব্যবহার হওয়ায় তা কার্যকর হচ্ছে না। তাই টানেল ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা, বিকল্প রুট ব্যবস্থাপনা এবং পণ্যবাহী যানবাহনকে টানেলমুখী করার কৌশলগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে দ্বিতীয় সংশোধনীতে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ প্রকল্পে চীন সরকারের ঋণ রয়েছে ৬ হাজার ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪ হাজার ৬১২ কোটি ১২ লাখ টাকা।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহনের ভিত্তিতে আয়কে লাভজনক ধরা হলেও বাস্তবে বর্তমানে মাত্র ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এর ফলে দৈনিক টোল আদায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকায়। অথচ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা বছরে প্রায় ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের বার্ষিক নেট নগদ প্রবাহ এখনো ঋণাত্মক। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগ খরচ পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিবেদনটি মাত্র তিন বছরের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা এত বড় প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করা হয়েছে। সাধারণত এমন প্রকল্পে ২০ থেকে ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন প্রয়োজন হয়।
ভবিষ্যতে ট্রাফিক বৃদ্ধি এবং টোল সমন্বয়ের মাধ্যমে ২০৪৩ বা ২০৫৩ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার ধনাত্মক হতে পারে বলে প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে টোল আয় পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে পারছে।
উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং সহায়ক অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে টানেলটি বর্তমানে লোকসানি অবস্থায় রয়েছে।
আর্থিক ঘাটতি থাকলেও টানেলটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ-আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে। প্রতিদিন ৪ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের মাধ্যমে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া আনোয়ারা অঞ্চলে নগর সম্প্রসারণ, পতেঙ্গা ও পারকি সৈকতে পর্যটক বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানেলের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। আনোয়ারা প্রান্তে বন্দরভিত্তিক শিল্প দ্রুত গড়ে তোলা এবং কর্ণফুলী ড্রাই ডক, চায়না রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এছাড়া ‘এক শহর দুই নগর’ ধারণা বাস্তবায়নে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার, আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং দুই প্রান্তে বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের আনোয়ারা অংশে পণ্য খালাস বাড়ানো, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার করিডোরের সড়ক উন্নয়ন এবং ফিডার সড়ক সম্প্রসারণের সুপারিশও করা হয়েছে।
টোল আদায়ে ইলেকট্রনিক টোল আদায় ব্যবস্থা চালু, সার্ভিস এরিয়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া এবং পর্যটন সংযোগ বাড়ানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি চট্টগ্রামকে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ে প্রত্যাশিত যানবাহন না আসা এবং আয়–ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার কারণে প্রকল্পটি আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তবে সঠিক নীতিনির্ধারণ, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে যানবাহন চলাচল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লে টানেলের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

