বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা (আইটিইএস) খাতের জন্য বিদ্যমান কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনের পরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এ খাতের জন্য সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
গতকাল বুধবার রাজধানী ঢাকায় প্রযুক্তি শিল্প নীতি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘অর্থ বিলের প্রভাব: টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি শিল্প’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়। বর্তমানে দেশের আইটি ও আইটিইএস খাতের কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ৩০ জুন। তবে চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এই সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত রাখা হয়নি।
ড্রিম৭১ বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশাদ কবির বলেন, চলতি বাজেটে কর অবকাশের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে কোনো বার্তা না থাকায় প্রযুক্তি খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, বিশ্ব অর্থনীতি যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এ ধরনের নীতিগত প্রণোদনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক পরিচালক রাশাদ কবির আরও বলেন, অধিকাংশ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রচলিত ব্যাংক ঋণ পেতে নানা সমস্যার মুখে পড়ে। কারণ তাদের কাছে জামানত হিসেবে ব্যবহারের মতো দৃশ্যমান সম্পদ থাকে না।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর। তিনি চলতি বাজেটে টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতে আনা বিভিন্ন কর পরিবর্তনের দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, টেলিযোগাযোগ খাতে সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এর বাইরে কাঠামোগত বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভয়েস ও ডেটা সেবায় মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ এবং সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশই বহাল রয়েছে।
ফাহিম মাশরুরের মতে, সিম কর তুলে দেওয়ার সুফল সাধারণ গ্রাহকের হাতে খুব বেশি পৌঁছাবে না। কারণ এই সুবিধার বড় অংশ টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে, গ্রাহকের ব্যয় কমাতে নয়। তিনি আরও জানান, চলতি বাজেটে কয়েকটি প্রযুক্তিপণ্যের কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
ল্যাপটপের মোট করের হার ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। কম্পিউটার মনিটরের ক্ষেত্রে তা ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। এ ছাড়া প্রিন্টারের কর ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফ্ল্যাশ মেমোরির করও ৩২ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশের নিচে এসেছে। তার মতে, এসব পণ্যে মোট করের বোঝা প্রায় ৫৪ থেকে ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে, যা এবারের বাজেটের অন্যতম বড় কর-স্বস্তির উদ্যোগ।
তবে তিনি কর কাঠামোয় বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, আমদানি করা স্মার্টফোনের ওপর এখনো মোট করের হার ৬০ শতাংশের বেশি। ফলে ল্যাপটপের তুলনায় স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা একই ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন কাজের জন্য ল্যাপটপের বদলে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। তাই কর সুবিধার বড় অংশ সাধারণ ব্যবহারকারীর নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
স্টার্টআপ খাত নিয়েও এবারের বাজেটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, নতুন উদ্যোগগুলোর জন্য অভিন্ন নয় বছরের প্রবৃদ্ধিকাল, শূন্য টার্নওভার কর, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত স্থানীয় বিক্রি ও আমদানি করা সেবায় মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি এবং কর ক্ষতি পরবর্তী বছরে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এসব সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলেও তিনি সতর্ক করেন।
রবি আজিয়াটার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, টেলিযোগাযোগ অপারেটররা সিম কর কমানো এবং অগ্রিম আয়কর সংক্রান্ত পরিবর্তনের দাবি বাস্তবায়নে সফল হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়লেও গ্রাহকরা তুলনামূলক কম সুবিধা পাবেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রতি ১০০ টাকার কথা বলার সেবায় গ্রাহকদের ৪০ টাকারও বেশি কর দিতে হয়। ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে করের বোঝার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো এশিয়ার অন্যতম উচ্চ কর আরোপকারী দেশ।

