ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছে সরকার। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে তফসিলি ব্যাংক থেকেই বন্ড ও ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা।
এত বড় অঙ্কের সরকারি ঋণ নেওয়ার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে সাধারণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। অন্যদিকে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণের হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়ে গেছে। জুন পর্যন্ত এ হার ২১ দশমিক ৬ শতাংশে থাকার কথা থাকলেও তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে। ফলে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ আগের সব রেকর্ড ও নির্ধারিত লক্ষ্য অতিক্রম করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সংশোধিত বাজেটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা কিন্তু ১৪ জুন পর্যন্ত সরকার মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ঋণ নেয়। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় অতিরিক্ত ১৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা বেশি ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের মূল বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পরে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার সেই লক্ষ্য কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্য ৯৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের নিট ব্যাংকঋণ কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। ফলে সরকারের অর্থের চাহিদা পূরণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এ ছাড়া একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং সরকারি পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক—উভয় উৎস থেকেই বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ১৪ জুন পর্যন্ত নেওয়া মোট ঋণের মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশ বা ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা এসেছে তফসিলি ব্যাংক থেকে। বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। এতে স্পষ্ট হয়, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এড়াতে নতুন টাকা ছাপিয়ে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর পথ থেকে সরে থেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ সীমিত রাখা হলেও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তার মতে, ঋণের সংকটে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও। দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ হওয়ার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আরও কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করছে, বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে আগামী অর্থবছরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। নতুন মুদ্রানীতিতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটে নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে কম।
নিট তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাত দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়েছে। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকে কতটা চাঙা করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

