লাগাতার মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার প্রভাবে দেশের কর্পোরেট খাত নতুন করে বড় চাপের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৭টি খাতের ২৩২টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ব্যাংকিং খাতে, যেখানে মুনাফা কমে রেকর্ড ১৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ নেতিবাচক অবস্থায় পৌঁছেছে।
আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত নিট মুনাফা নেমে এসেছে ২ হাজার ৭৬৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়। এক বছর আগে একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৪ হাজার ৯৬২ কোটি ১১ লাখ টাকা।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৩২টি কোম্পানি তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জুলাই-জুন অর্থবছর অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৯ মাসের আর্থিক ফল প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম প্রান্তিকের হিসাব দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ২০২৫ সালের ধীরগতির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর চলতি বছরের এই মুনাফা সংকোচন কর্পোরেট খাতকে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার ঝুঁকিতে ফেলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে, অথচ মুনাফার পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মুনাফা ছিল ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। চলতি বছরে সেটি উল্টো ৬৫১ কোটি ৪৭ লাখ টাকার লোকসানে পরিণত হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র পাঁচটি ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসান পুরো খাতের চিত্র বদলে দিয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং রূপালী ব্যাংকের সম্মিলিত নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা কমেছে ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে। এই খাতে মুনাফা ২ হাজার ৭৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে লোকসানে পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া সিরামিক খাতে মুনাফা ৪৩৮ শতাংশ এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ১০৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। টেক্সটাইল খাতের মুনাফা কমেছে ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশ। সিমেন্ট খাতেও আয় কমেছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ।
সামগ্রিক মন্দার মধ্যেও কয়েকটি খাত ভালো করেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মুনাফা ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৮১৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
টেলিযোগাযোগ খাতেও ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই খাতের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ। তবে ধারাবাহিকভাবে ভালো করা ওষুধ খাতেও প্রায় ৯ শতাংশ মুনাফা কমেছে।
লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরির পরিচালক আবদুল্লাহ আল ফয়সালের মতে, কোম্পানিগুলোর বিক্রি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও দুর্বল চাহিদা, ব্যাংকিং খাতের সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত সমস্যার কারণে নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, সরকারি মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতির ওপর পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকেই শিল্প খাত কাঠামোগত সংকটে রয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ শিল্প খাতকে আরও চাপে ফেলেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগেও উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, শিল্প খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় চলতি মূলধনের সংকট কাটছে না।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সিমেন্ট শিল্প এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তবে নতুন সরকারের উন্নয়ন উদ্যোগ ভবিষ্যতে এই খাতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ প্রথম প্রান্তিকে ১১২ কোটি ২০ লাখ টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি তাদের মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বছরের বাকি সময়ও চ্যালেঞ্জিং থাকবে বলে মনে করছে কোম্পানিটি।
প্রথম প্রান্তিকে ২৩২টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৯৩৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কম।
রাজস্বের দিক থেকে ব্যাংকিং খাত শীর্ষে রয়েছে। এরপর রয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ, ওষুধ ও কেমিক্যাল এবং টেক্সটাইল খাত।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৪টি কোম্পানি প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মুনাফা নেমে এসেছে মাত্র ৪৫ কোটি টাকায়। আগের বছরের একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ১৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন প্রকাশ করা কোম্পানিগুলোর অর্ধেকই লোকসানে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক সংঘাত, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং প্রধান রপ্তানি বাজারে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তৈরি পোশাকের বিক্রি ও নতুন ক্রয়াদেশ কমেছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলো নীতিগত সহায়তা দিলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

