সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি খাত প্রত্যাশিত গতি পায়নি। পুরো বছরের হিসাবে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৮০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় আয় কমেছে ২০ কোটি ডলার, যা শতাংশের হিসাবে শূন্য দশমিক ৫৮।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসেই রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম ছিল।
অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়লেও আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা আট মাস নিম্নমুখী ছিল। এপ্রিলে রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বেড়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আগের বছরের একই মাসে রপ্তানি অস্বাভাবিকভাবে কম থাকায় ওই প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা যায়। মে মাসে আবার রপ্তানি কমে যাওয়ায় সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। বছরের শেষ মাস জুনে অবশ্য রপ্তানি ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময় পতনের কারণে সামগ্রিক হিসাবে অর্থবছরটি নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যেই শেষ হয়েছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৬৪৩ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলার। তবে ওই সময় পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের হিসাবে গরমিলের অভিযোগ পরে সত্য প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ অর্থবছরে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বেশি রপ্তানি দেখানো হয়েছিল।
বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় কারণই কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরুতেই রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি করে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও পরে তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ হওয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে ওইসব বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
গত অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকেই এসেছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। অন্য সব পণ্য মিলিয়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৯৩০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের বাড়তি প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের রপ্তানিকে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, বন্দর ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং পশ্চাৎসংযোগ শিল্পের দুর্বলতার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এসব দুর্বলতা কাটিয়ে আধুনিক উৎপাদন ও বিপণন কৌশল গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তৈরি পোশাকের বাইরে কয়েকটি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৩ কোটি ডলারে। কৃষিপণ্য রপ্তানি ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে হয়েছে ৯৮ কোটি ডলার। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ৯৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮৮ কোটি ডলার। আর প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানিতে প্রায় ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে, যার মোট মূল্য ৬৫ কোটি ডলার।

