মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ মোট ৬০টি পণ্যের দাম কমানোর ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পাশাপাশি খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও গোলমরিচের মতো কয়েকটি আমদানিনির্ভর মসলার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমানো হয়। ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হলেও বাজারে এখনো তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বিভিন্ন বাজার ঘুরে বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
বাজেটে খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও ধনিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়। তবে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব পণ্যের দামে এক টাকাও কমেনি। বরং কাজুবাদামের দাম কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও ঢাকার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী হাফেজ হাজি মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে দেশে বৈধভাবে জিরা আমদানি হচ্ছে না। অথচ সরকার জিরার কেজিতে ২৫০ টাকা এবং এলাচের কেজিতে ১ হাজার ৪০০ টাকা শুল্ক নির্ধারণ করেছে।
অন্য মসলাতেও উচ্চহারে শুল্ক রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় এই শুল্ক অনেক বেশি হওয়ায় বৈধ আমদানির পরিবর্তে চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারে এসব পণ্য প্রবেশ করছে। তার ভাষ্য, দেশের চাহিদার অর্ধেকও বৈধভাবে আমদানি হচ্ছে না। সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মসলা ঢুকছে। তাই শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমিয়ে বাজারে দাম কমানো সম্ভব নয়। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ এবং বাজার তদারকি জোরদার না করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
খুচরা বিক্রেতারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের লিটন বনাজী স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মৃদুল বলেন, পাইকারি বাজারে দাম না কমলে খুচরা বাজারেও কমানো সম্ভব নয়। তার মতে, আমদানিকৃত নতুন চালান দেশে এলে তখন দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে লবঙ্গ কেজিপ্রতি দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫২০ টাকা, জিরা ৬০০ টাকা, কিশমিশ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং এলাচ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে কাজুবাদামের দাম কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে দেড় হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
খেজুরের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক শূন্যে নামানো হলেও বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন আমদানিকারক ও বিক্রেতারা। বাংলাদেশ ফল আমদানিকারক সমিতির সদস্য মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, খেজুর আমদানিতে মোট পাঁচ স্তরের শুল্ক কার্যকর রয়েছে। একটি পাঁচ কেজির মেডজুল খেজুরের প্যাকেটে দুই হাজার টাকারও বেশি শুল্ক দিতে হয়। এবার শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে আমদানি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা কমতে পারে। তবে ভোক্তা পর্যায়ে এই পার্থক্য কার্যত চোখে পড়বে না। খুচরা বিক্রেতারাও জানান, আগের দামেই খেজুর বিক্রি হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হারও কমানো হয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎসে কর ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের আশা ছিল, এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে। তবে বাজারে এখনো সেই সুফল মিলছে না।
গতকাল বিভিন্ন বাজারে মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা, আটাশ চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, দুই কেজির আটার প্যাকেট ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আদা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা, আলু ৩০ টাকা, দেশি রসুন ১০০ টাকা এবং চীনা রসুন ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের মনির স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বোরো মৌসুম শেষ হয়েছে, বাজেটও কার্যকর হয়েছে, কিন্তু কোনো পণ্যের দাম কমেনি। ফলে আগের দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাজেটে দাম কমার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। বরং কাজুবাদামসহ কয়েকটি পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। তার মতে, কার্যকর বাজার তদারকি ছাড়া দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী শাহ আলম খানও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।
মাছ ও মাংসের বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। তেলাপিয়া মাছ আকারভেদে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। রুই ও কাতলা মাছ ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। চিংড়ি, কাজলি, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন নদীর মাছের দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি। অন্যদিকে চাষের কিছু মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
সোনালি মুরগির দাম আগের মতোই কেজিতে ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা রয়েছে। তবে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় উঠেছে। দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডিম প্রতি ডজন ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

