সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বাংলাদেশের রফতানি আয় বেড়েছে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। বছরের শেষ দিকে এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি না হলে পুরো অর্থবছরের রফতানি চিত্র আরও দুর্বল হয়ে উঠত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে খাতসংশ্লিষ্ট অনেক উদ্যোক্তা এই প্রবৃদ্ধিকে ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক সংকেত হিসেবে দেখছেন না।
তাদের ভাষ্য, জুন মাসের এই উল্লম্ফন নতুন রফতানি আদেশ বাড়ার ফল নয়। বরং ক্যালেন্ডারভিত্তিক সময়সূচির কারণে রফতানি চালান এক মাসে বেশি সম্পন্ন হওয়ায় এমন প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে এটিকে স্থায়ী ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এদিকে শিল্প খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা কমে এসেছে, নতুন রফতানি আদেশও আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শিল্প-পুলিশ, উদ্যোক্তা সংগঠন এবং শ্রমিক নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশের পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এ ছাড়া অনেক কারখানা এখনো চালু থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে দেশের রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে।
জুনের প্রবৃদ্ধি নিয়ে কেন উঠছে প্রশ্ন?
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ১ শতাংশ কম। একই সময়ে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকের রফতানিও কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তবে এর মধ্যেই জুন মাসে এককভাবে রফতানি আয় প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবধানের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তাঁর বক্তব্য, ২০২৫ সালের জুনে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনে কার্যদিবস ছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। ফলে উৎপাদন এবং রফতানি—দুই ক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবেই বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তাঁর মতে, এই বৃদ্ধি মূলত ক্যালেন্ডারের পার্থক্যের প্রভাব। নতুন ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার কারণে এমন প্রবৃদ্ধি হয়নি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু জুন মাসের এই ইতিবাচক পরিসংখ্যান দেখে স্বস্তির সুযোগ নেই। কারণ পুরো অর্থবছরজুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দুর্বল ছিল। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি অধিকাংশ কারখানার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে পুরো বছরই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে।
একের পর এক কারখানা বন্ধ, কমছে উৎপাদনের গতি:
দেশের শিল্প খাতে সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিল্প-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। তবে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতাদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা পাঁচ শতাধিকেরও বেশি। তাঁদের মতে, ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা বন্ধ হলেও সেগুলোর তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি। যদিও সংগঠনটির নিজস্ব হিসাব বলছে, এই সংখ্যা ২২১টি। এ ছাড়া বিকেএমইএর ৩৫টি, বিটিএমএর ৮টি, বেপজার ১৯টি এবং অন্যান্য শিল্প খাতের ২৮৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
শুধু কারখানা বন্ধই নয়, উৎপাদন চালু থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। বিজিএমইএর হিসাবে ১ হাজার ৩২১টি এবং বিটিএমএর হিসাবে ১ হাজার ১২১টি কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন থেকে পিছিয়ে রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তাদের সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করে উৎপাদন চালাচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি সংকট। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-পঞ্চমাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং, যা উৎপাদন কার্যক্রমকে আরও ব্যাহত করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক কারখানাকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে ডিজেল ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, শিল্প টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, শুধু ঋণ সহায়তা দিয়ে শিল্পকে সচল রাখা সম্ভব নয়, যদি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত না করা যায়।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও মিলছে না ন্যায্য দাম:
একদিকে উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের মূল্য বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। সুতার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। ডাইং ও বিভিন্ন রাসায়নিকের মূল্য বেড়েছে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অর্থায়নের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনেও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে, আবার কেউ পুরোপুরি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি)। সাম্প্রতিক উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের মার্চ ও জুন—উভয় মাসেই ইউডির সংখ্যা এবং আর্থিক মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বিশেষ করে জুনে ইউডির মোট মূল্য প্রায় ২২৭ কোটি ডলার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৯ কোটি ডলারে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, জুন মাসে রফতানি আয় বাড়লেও ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন রফতানি আদেশ সেই অনুপাতে আসছে না। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, এটাই এখন রফতানি শিল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
গাজীপুরে বাড়ছে কারখানা বন্ধের ঘটনা:
দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে শিল্প সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে। গত এক সপ্তাহেই সেখানে ১৩টি পোশাক কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে লিথী গ্রুপের পাঁচটি ইউনিট, এপেক্স গ্রুপের চারটি ইউনিট, ইউনিক ডিজাইনার্স, ইউনিক ওয়াশিং, ইসলাম গার্মেন্টস, ফ্যাশন লিংকার্স এবং কোরটেক্স অ্যাপারেলস।
কোনো প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে, কোথাও নতুন অর্ডার কমে গেছে। আবার কিছু কারখানা শ্রমিক অসন্তোষ কিংবা ব্যাংকঋণের চাপ সামলাতে না পেরে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু একটি খাতের সংকট নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির প্রভাব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর পড়বে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে। তাঁর মতে, যেসব কারখানার পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেগুলোর জন্য কার্যকর এক্সিট পলিসি প্রয়োজন। আর যেসব প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম, তাদের সহজ শর্তে পরিচালন মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
রফতানিকারকদের আশঙ্কা, আগামী সময়ের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং উৎপাদন ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ কারণে শুধু জুন মাসের প্রবৃদ্ধিকে রফতানি খাতের স্থায়ী পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং কারখানা বন্ধের প্রবণতা থামানো, নতুন রফতানি আদেশ বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট নিরসন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী অর্থবছরে দেশের রফতানি খাত আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে জুনের রফতানি পরিসংখ্যান কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও শিল্পাঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। রফতানি খাতের টেকসই পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং নতুন রফতানি আদেশ—এই চারটি ভিত্তিকে কত দ্রুত শক্তিশালী করা যায়, তার ওপর।

