রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ, রুগ্ণ ও অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি ও অবকাঠামো বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন খাতের শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি মালিকানাধীন ১০ হাজার একরের বেশি অব্যবহৃত শিল্পজমির তালিকা প্রকাশ করেছে।
বিডার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থার অধীন ৪৪টি বিনিয়োগযোগ্য স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সংস্থা হলো বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ ইস্পাত শিল্প করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশন (বিটিএমসি)।
বিডার কর্মকর্তারা জানান, তালিকাভুক্ত জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত জমি, খালি এলাকা এবং বর্তমানে কৃষিকাজে ব্যবহৃত জমি। এসব স্থান দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরে অবস্থিত। সেখানে আগে থেকেই সড়ক যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং শিল্প অবকাঠামোর সুবিধা রয়েছে। ফলে এককভাবে, যৌথভাবে অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ইজারা নিয়ে নতুন শিল্পকারখানাও গড়ে তুলতে পারবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
সবচেয়ে বেশি অব্যবহৃত জমি রয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন বন্ধ ও আংশিক চালু ১৩টি চিনিকলে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাড়ে আট হাজার একরেরও বেশি জমি বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে না। শুধু চিনিকল নয়, ভারী শিল্প ও বস্ত্র খাতের বিভিন্ন সচল বা আংশিক সচল সরকারি কারখানাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বিডা জানিয়েছে, বাংলাদেশ ইস্পাত শিল্প করপোরেশনের অধীন সীতাকুণ্ডে অবস্থিত দেশের একমাত্র সরকারি গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান প্রগতির ৩১ একর জমির মধ্যে ১০ একরই খালি পড়ে রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিএসইসির অধীন চারটি কারখানায় মোট ১৬০ একরের বেশি অব্যবহৃত জমি রয়েছে। এসব স্থানে আধুনিক স্টিল মিল, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদন, চার্জিং সরঞ্জাম, মোটরযানের যন্ত্রাংশ তৈরি বা সংযোজন, বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারের খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশনের ২৩৮ একর এবং বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশনের ৯২৫ একর জমিও বর্তমানে খালি রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের অধীন ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিলের ১১০ একর জমিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিডা জানিয়েছে, সেখানেও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে।
বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান বলেন, সরকারের অধীনে ১০০টিরও বেশি শিল্পকারখানায় অব্যবহৃত জমি রয়েছে। প্রথম ধাপে ৪৪টি কারখানার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রতিটি স্থানের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গা নির্বাচন করতে পারেন। এরপর তারা নির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিলে তা দ্রুত মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, দেশি ও বিদেশি—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগের প্রস্তাব দিতে পারবে। ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে কয়েকটি স্থানের জন্য বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আশা করছে বিডা।
তবে সম্ভাবনা থাকলেও উদ্যোক্তাদের বড় উদ্বেগ গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। তাঁদের মতে, দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প এলাকায় বিনিয়োগকারীরা এখনও গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যায় না। তাই নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের নিশ্চয়তা চান তাঁরা।
এ বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো কমিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে বেজা, বিডা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত সমন্বয় করছে। বিশেষ করে জ্বালানিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে তিনি নিজেও প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
আশিক চৌধুরী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতি সপ্তাহেই দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে তিনি নিয়মিত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।

