বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে একের পর এক নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনা, ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা এবং নতুন উদ্দীপনা প্যাকেজ ঘোষণার পরও উদ্যোক্তাদের আস্থা পুরোপুরি ফিরছে না। ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে নানা নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এসব উদ্যোগ এখনো বেসরকারি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য গতি আনতে পারেনি। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থির অবস্থায় রয়েছে, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পাঁচশ বিলিয়ন ডলারের বেশি আকারের অর্থনীতিকে সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে। এর লক্ষ্য হলো বন্ধ হয়ে থাকা উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় সচল করা এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এসব উদ্যোগের পরও উদ্যোক্তাদের আস্থা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফিরে আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে। দেশের ইতিহাসে এটি তৃতীয় সর্বনিম্ন মাসিক প্রবৃদ্ধি। এর আগে মার্চে ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
প্রকৃতপক্ষে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, দেশের বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে মন্থরতা বিরাজ করছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তব চিত্র সেই লক্ষ্যের তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের উচ্চ ঝুঁকির কারণে ব্যাংকগুলো এখন নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক। অন্যদিকে জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় বলে বিবেচিত করনীতি উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে সমস্যায় থাকা ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বকেয়া ঋণের মাত্র ২ শতাংশ পরিশোধ করেই ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়।
পরে দেখা যায়, অনেক ঋণগ্রহীতার জন্য সেই ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই গত ফেব্রুয়ারিতে নিয়ম শিথিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয়, অনুমোদনের সময় নির্ধারিত অর্থের অর্ধেক পরিশোধ করলেই হবে। বাকি অর্ধেক ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করা যাবে। তার ভাষায়, এসব সুবিধা চালুর পরও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
তবে তিনি আশাবাদী যে, মে মাসে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ আগামী দিনে ঋণের চাহিদা বাড়াতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি গত মাসে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ করায় ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক ঋণের ব্যয়ও কিছুটা কমবে বলে তিনি মনে করেন।
গত ৩০ জুন জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান জানান, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারণা করেছিল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান ব্যবসা পরিবেশে টিকে থাকাই উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। তার মতে, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং ব্যবসাবিরোধী করনীতির কারণে নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবাই কঠিন। তিনি বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা কে ভাববে? ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি কীভাবে হলো, কারা এই ঋণ নিয়েছেন এবং তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।”
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, দিনের শেষে উৎপাদন চালাতে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। সেটি না থাকলে সবকিছুই থেমে যায়।
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত নানা সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এসব অঞ্চলের বাইরে বিনিয়োগ করা দেশীয় উদ্যোক্তারা সেই সুবিধা পান না। এতে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার ভাষায়, বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে দেশীয় উদ্যোক্তারাও যেন সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারেন, সেদিকেও সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ঋণপত্র খোলার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তিনি জানান, বেসরকারি খাত থেকে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তার মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থায় থাকার কারণে দেশ ধীরে ধীরে স্থবির মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। আগে এটি ৬ শতাংশের বেশি ছিল, এখন তা ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। তার ভাষায়, এটি এখন আর শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং অত্যন্ত চিন্তার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম খুব সীমিত ছিল। ফলে ব্যবসার পরিবেশ দুর্বল হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

