দেশের আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে হাজার হাজার রাজস্ব মামলা। কোনোটি ১০ থেকে ১৫ বছর, আবার কোনোটি এক বা দুই যুগ ধরেও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলার কারণে সরকারের প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে নতুন নতুন মামলাও যুক্ত হচ্ছে। ফলে অনাদায়ী রাজস্বের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাজটের অন্যতম কারণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দক্ষতা ও সক্ষমতার ঘাটতি। আদালতে যথাসময়ে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারা, মামলার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং ঘন ঘন বদলির কারণে দীর্ঘসূত্রতা আরও বাড়ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও শুল্কসংক্রান্ত প্রায় ৩১ হাজার ৭০০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় জড়িত রাজস্বের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা এখনো সরকারের কোষাগারে জমা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব মামলা পরিচালনায় পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ আইনজীবীদের দিয়ে মামলা পরিচালনা করতে হয়। এতে আইনি লড়াইয়ে দুর্বলতা থেকে যায় এবং মামলা নিষ্পত্তি আরও দীর্ঘ হয়।
তাদের মতে, আদালতে আটকে থাকা এই রাজস্ব আদায় করা গেলে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি অনেকটাই দূর হতো। এমনকি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারত। এতে সরকারের অর্থসংকট কমার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, এক বা দুই যুগ আগে দায়ের হওয়া বহু রাজস্ব মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। এর সঙ্গে নিয়মিত নতুন মামলাও যুক্ত হচ্ছে। কবে এসব মামলার নিষ্পত্তি হবে বা জড়িত প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব কবে আদায় করা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশেষ আদালত গঠনের মাধ্যমে জমে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ করেছিলেন। তবে সেই উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এনবিআরের দক্ষ কর্মকর্তারা অনেক সময় এসব মামলার দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখান না। আবার কোনো কর্মকর্তা যখন একটি মামলার বিষয়ে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তার বদলি হয়ে যায়। নতুন কর্মকর্তা এসে পুরো বিষয়টি নতুন করে বুঝতে সময় নেন। এতে মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, আদালতে মামলা পরিচালনা করতে নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়। মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব তুলনামূলক সহজ হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা আদালতসংশ্লিষ্ট কাজে আগ্রহী হন না। তিনি আরও দাবি করেন, কিছু অসাধু কর্মকর্তা মামলার বিপক্ষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করেন। এনবিআরের নিজস্ব তদন্তেও এ ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এনবিআরের আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন বলেন, সাধারণত করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওনা রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেওয়ার পর অনেকেই আদালতের আশ্রয় নেন। মামলা চলমান থাকলে এনবিআরের পাওনা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হয় না। অনেক করদাতা এটিকে সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং এটি কর ফাঁকির একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এনবিআরকে আরও দক্ষ ও কৌশলী হতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও আদালতে রাজস্ব মামলার সংখ্যা কমছে না, বরং বাড়ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ৮৮ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। তিনি মনে করেন, মামলা বাড়ানোর পরিবর্তে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর) আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। নতুন সরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এনবিআরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট ৩১ হাজার ৭০০টি বিচারাধীন মামলার মধ্যে করসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭০০। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূসকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি এবং জড়িত অর্থ ৩৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুল্কসংক্রান্ত মামলা রয়েছে ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই রয়েছে প্রায় ১২ হাজার মামলা, যেখানে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে পুরোনো মামলার জট কাটার আগেই এনবিআর নতুন করে প্রায় এক লাখ আয়কর রিটার্ন অডিট শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ৯২ হাজার ৮৪৯ জন করদাতাকে অডিটের জন্য নির্বাচন করে এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রের আশঙ্কা, এসব অডিটের বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে আরও নতুন মামলা আদালতে যুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরামের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রউফ বলেন, রাজস্ব মামলার জট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি কমাতে এনবিআরকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১১ সালে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি চালু করা হলেও সেটি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
তার মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব মামলা রয়েছে হাইকোর্ট বিভাগে। শুধু ভ্যাটসংক্রান্ত মামলাই প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি, যেখানে জড়িত অর্থ প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, ভ্যাট বিভাগ, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এবং আদালত যৌথভাবে বিশেষ কর্মসূচি নিলে একই ধরনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবং ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, রাজস্ব আইন ও বিধির ভিন্ন ব্যাখ্যা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কর নির্ধারণে মতপার্থক্যের কারণেই মামলার সংখ্যা বাড়ছে। তার মতে, কর নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও রিটার্ন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা গেলে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত কমবে। এতে কর প্রশাসন ও করদাতাদের মধ্যে বিরোধও হ্রাস পাবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠবে।

