দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ব্যবস্থা আরও সহজ ও আধুনিক করতে সরকারের নেওয়া বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের আগে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, পরিকল্পনার সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত এই সংস্কার প্যাকেজকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করার মতো নানা পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, এর বাস্তব সুফল পেতে হলে প্রশাসনিক সক্ষমতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। তার ভাষায়, বাংলাদেশে বহু বছর ধরে নানা ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতা এখনো কাটেনি।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ। যদি সত্যিই ডিজিটাল একক সেবা, স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান কার্যকর করা যায়, তাহলে তা কর ছাড়ের চেয়েও বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, এই সংস্কার প্যাকেজ দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রধান ভিত্তি আর্থিক প্রণোদনা নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্কার।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, শুধু নিয়ম-কানুন সহজ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অনিশ্চয়তা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর না হলে সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা একা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।
সরকারের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা হ্রাস করা। একই সঙ্গে জননিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং রাজস্ব সুরক্ষার বিষয়গুলোও বজায় রাখা হবে।
এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল একক প্ল্যাটফরম চালু করা। এর মাধ্যমে ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স গ্রহণ, বিভিন্ন অনুমোদন এবং আবেদনের অগ্রগতি একই জায়গা থেকে সম্পন্ন করা যাবে। সরকার জানিয়েছে, আবেদন সঠিক হলে অধিকাংশ সেবা সাত দিনের মধ্যেই দেওয়া হবে। এ ছাড়া সব অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বাধ্যতামূলক করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাড়া না মিললে কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের ব্যবস্থাও চালু হতে পারে।
কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত করা হচ্ছে। নাম অনুমোদন, ফি পরিশোধ এবং নিবন্ধন সনদ প্রদান—সবকিছু অনলাইনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা শুরুতে অনলাইনে অস্থায়ী অনুমোদন পাবেন। এতে তারা দ্রুত ব্যবসা শুরু করতে পারবেন এবং পরবর্তী ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব নিয়ম পূরণ করবেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিভিন্ন সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। কর্মী নিয়োগের অনুমতি সাত দিনের মধ্যে, বিনিয়োগ ভিসা দশ দিনের মধ্যে প্রদান এবং পাঁচ বছরের একাধিকবার প্রবেশযোগ্য ভিসা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার বিনিয়োগকারী সহায়তা কেন্দ্র এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা আরও জোরদার করতে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদের পরিকল্পনাও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ট্রেড লাইসেন্স সেবাও ধাপে ধাপে জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে যুক্ত হবে। এতে আবেদন, নবায়ন এবং অর্থ পরিশোধ পুরোপুরি অনলাইনে করা যাবে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। সেখানে জমি, বিদ্যুৎ, পানি এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক অনুমোদন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকবে। ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবে। লাভ এবং মূলধন বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়াও সহজ করা হচ্ছে। প্রফিট রিপ্যাট্রিয়েশন সংক্রান্ত আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের টাকা হিসাবের মাধ্যমে কেনা সিকিউরিটিজ থেকে পাওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনা ও পুনর্বিনিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সহজ করা হয়েছে। নিরীক্ষকের সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ায় এখন মাত্র এক কর্মদিবসেই এসব লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
নিবন্ধিত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক থাকবে না। পাশাপাশি বড় অঙ্কের লেনদেনেও বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদনের শর্ত শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বস্ত আমদানিকারকদের জন্য ডকুমেন্টস এগেইনস্ট পেমেন্ট এবং টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। এর ফলে ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক ঋণপত্রের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার আন্তঃসংযোগ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
নির্মাণ অনুমোদন ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পরিবেশ ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, জমি এবং ভবনসংক্রান্ত অনুমোদন একটি অনলাইন প্ল্যাটফরমে একত্র করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন সম্পন্ন করার পাশাপাশি কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পের জন্য ঝুঁকিভিত্তিক দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা হবে।
সংস্কারের অগ্রগতি তদারকির জন্য সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট চালু করা হবে, যেখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি অনুসরণ করতে এবং বিলম্ব বা অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারবে।

