কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে সরকারি অর্থের ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠে এসেছে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক অবৈধ সমঝোতা করা হয়েছে।
ভেরিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, কাজের মূল্য বাড়িয়ে দেখানো এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির কারণে সরকারি অর্থের বড় অঙ্কের অপচয় হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্বেরও বড় ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পুরো সময়ে মোট ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা অংশে দেখা যায়, ঠিকাদার প্রকৃতভাবে যত কাজ করেছেন এবং যত খরচ করেছেন, তার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের ১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে নির্মাণকাজ সময়মতো শেষ হয়নি, কিন্তু কোনো ধরনের জরিমানা আরোপ না করে বরং তাকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এতে সরকারের আরও ২৮৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি কেনাকাটাসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করে এবং কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই ব্যয়কে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে কেনাকাটা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের চিত্র উঠে এসেছে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়কে নির্মাণকাজের ব্যয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে সরকারের ৪৮ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।
প্রকল্পটি ‘টার্নকি’ পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ নকশা, নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহ এবং কাজ শেষ করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই চুক্তির আওতায় ভেরিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ৫৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই প্রকল্পে তত্ত্বাবধায়ক পরামর্শক থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে নির্মাণকাজের জন্য নতুন পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে অতিরিক্ত ৭০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিদেশি পণ্য কেনা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘন করে এই অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর ফলে ৪২ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হয়। এছাড়া অযৌক্তিক মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে আরও ২২৪ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।
টানেলের জন্য প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণে ৫০৩ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। পাশাপাশি প্রকল্প সাইট অফিসে বাংলো মেরামতে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা এবং ডিজেল জেনারেটর কেনায় আরও ৬ কোটি টাকা অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের কাজ বারবার দেখিয়ে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাও ধরা পড়েছে নিরীক্ষায়। এতে অতিরিক্তভাবে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ব্যবহার করা যানবাহনগুলো নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পে ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত না দিয়ে ব্যক্তিগত বা অন্য কাজে ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ১৪ কোটি টাকার সম্পদের অপচয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়া ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও বৃক্ষরোপণ কাজ যথাযথভাবে না করায় ৪৯ কোটি টাকা অপচয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরামর্শকদের থাকা-খাওয়ার খাতে ৮ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় বিধিমালা না মেনে ভেরিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে কাজের পরিধি পরিবর্তন করায় আরও ৭৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত ক্ষেত্রেও অনিয়ম ধরা পড়েছে প্রতিবেদনে। পরামর্শকের পাওনা থেকে সঠিকভাবে আয়কর কর্তন না করায় প্রায় ৯ কোটি টাকা এবং সাব-কন্ট্রাক্টরের বিল পরিশোধের সময় নির্ধারিত ভ্যাট কেটে না রাখায় আরও ২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে সিএজি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্জিত সুদ জমা না দেওয়ায় রাজস্ব ক্ষতি:
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের অর্জিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকারের ২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সরকারি ক্রয় পদ্ধতি উপেক্ষা করে এবং কাজের প্রকৃত মূল্য যাচাই ছাড়াই ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করা হয়। এতে ৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে দাতা সংস্থার অর্থ সরাসরি ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর ব্যাংক হিসাবে পরিশোধের প্রক্রিয়ায় ১৪ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।
২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্প কর্মকর্তারা আইএফআইসি ব্যাংক এবং মিডল্যান্ড ব্যাংকে অনিয়মিতভাবে ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) স্থাপন করেন। এতে সরকারের ১৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। একই দুই অর্থবছরে আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত আর্থিক বিবরণী এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়। এই ব্যবধান থেকে ৩৩ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতির অডিট আপত্তি ওঠে।
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে অগ্রিম অর্থ প্রদান করা হলেও নির্ধারিত ভূমি প্রকল্প কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়নি। এতে ১০৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে টাগ বোট ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। এছাড়া প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাবে না থাকা সত্ত্বেও ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরির জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে আরও ৪৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
প্রকল্পের শুরু থেকেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও উঠে এসেছে নিরীক্ষায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে অগ্রিম বিল প্রদানসহ নানা অনিয়মে ২০১ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি ধরা পড়ে। একই অর্থবছরে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসককে প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয় হিসেবে ৪ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। পরবর্তী ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও একই ধরনের অনিয়ম ঘটে এবং আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়।
ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অনিয়মে ওই সময়ে মোট ১৪৩ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি পরামর্শকের বিল থেকে সঠিকভাবে আয়কর কর্তন না করায় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যে বিমা কাভারেজ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, তা বাস্তবায়ন না করায় প্রকল্পে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থেকে যায়।
টানেল চালাতে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ১০ লাখ টাকা:
কর্ণফুলী টানেলের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাফিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব ব্যবহারের বড় ব্যবধান এবং দুর্বল পরিকল্পনার কারণে টানেলটি এখন জাতীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় ধারণা করা হয়েছিল, উদ্বোধনের পর প্রতিদিন প্রায় ১৭ হাজার যানবাহন টানেল ব্যবহার করবে। আরও বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টিতে পৌঁছাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে, যা পূর্বাভাসের প্রায় ১৪ শতাংশ।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, টানেলটি পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। টোল আদায় থেকে যে আয় হচ্ছে, তা মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে পারছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করাই যথেষ্ট ছিল না, এর সঙ্গে সংযোগকারী শিল্পাঞ্চল, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। দুর্বল সংযোগ সড়ক এবং পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের অভাবে টানেলটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, ফলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না।

