বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানির সংকট এবং বিদ্যুতের দামই বেশি গুরুত্ব পায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানির ঋণের চাপ, আর্থিক ক্ষতি, সঞ্চালন ক্ষয় এবং অব্যবহৃত সক্ষমতা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুরো ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু বিদ্যুতের মূল্য বা জ্বালানি সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা।
প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে কি এখনো পুরোনো চিন্তাধারায় পরিচালনা করা হচ্ছে? কোনো সমস্যা দেখা দিলেই নতুন সঞ্চালন লাইন, নতুন উপকেন্দ্র কিংবা বড় প্রকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ার পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোকে আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, সেন্সর এবং উন্নত পরিচালন পদ্ধতির মাধ্যমে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা কি সময়ের দাবি নয়?
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পুঞ্জীভূত লোকসানও প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সক্ষমতা তৈরি হলেও তার উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। একই সময়ে সঞ্চালন ক্ষয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশে। পাশাপাশি ৭৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই পরিসংখ্যান শুধু আর্থিক অবস্থার চিত্র নয়। এগুলো বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনার সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানির ঋণ বা লোকসানকে সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা-লোকসানের দৃষ্টিতে দেখা ঠিক হবে না। কারণ বিদ্যুৎ আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক অবকাঠামো। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি, শিল্পকারখানা, ওষুধ উৎপাদন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট—সব ক্ষেত্রই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর।
কোনো সঞ্চালন লাইন হয়তো নির্দিষ্ট বছরে সরাসরি আর্থিক লাভ দেখাতে পারে না। কিন্তু সেটি যদি একটি শিল্পাঞ্চল সচল রাখে, কোনো হাসপাতালের বিদ্যুৎ নিশ্চিত করে কিংবা কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়, তাহলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কেবল হিসাবের খাতায় ধরা পড়ে না। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করা নয়; বরং সবার জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও ন্যায্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। তবে জনস্বার্থের কথা বলে অদক্ষতা, ভুল পরিকল্পনা, অতিরিক্ত ঋণ কিংবা অব্যবহৃত অবকাঠামোকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে এসব ব্যয়ের পুরো বোঝা ভোক্তার ওপর চাপিয়ে সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোও স্থায়ী সমাধান নয়।
সঞ্চালন চার্জ বাড়ালে প্রতিষ্ঠানটির আয় কিছুটা বাড়তে পারে কিন্তু যদি বিদ্যমান অবকাঠামো দক্ষভাবে ব্যবহার না হয়, সঞ্চালন ক্ষয় কমানো না যায় কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, তাহলে সমস্যার মূল কারণ থেকেই যাবে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের চাপ সাধারণ গ্রাহক ও জাতীয় অর্থনীতিকেই বহন করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতে অনেক সময় শুধু উৎপাদনের পরিমাণকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। অথচ আধুনিক ব্যবস্থাপনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদ্যুৎ কোথায় উৎপাদিত হচ্ছে, কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এবং কীভাবে তা সঞ্চালিত হচ্ছে।
ঢাকার আশপাশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়মিত উৎপাদন করতে না পারলে দূরের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আনতে হয়। এতে সঞ্চালন লাইনের ওপর চাপ বাড়ে, বিদ্যুৎ ক্ষয় বৃদ্ধি পায়, ভোল্টেজের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পুরো গ্রিডের পরিচালনা ব্যয়ও বেড়ে যায়। তাই শুধু বিদ্যুৎ আছে কি না, সেটিই বিবেচ্য নয়; বরং কোন পথে বিদ্যুৎ যাচ্ছে এবং সেই পথটি কতটা সাশ্রয়ী ও কার্যকর, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে ভোল্টেজ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক শক্তির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন পানির পাইপে শুধু পানি থাকলেই হয় না, পর্যাপ্ত চাপও প্রয়োজন হয়; তেমনি বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উৎপাদনের পাশাপাশি ভোল্টেজ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সহায়ক শক্তি।
এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি সঞ্চালন সমস্যার প্রথম সমাধান নতুন লাইন নির্মাণ হওয়া উচিত নয়। নতুন শিল্পাঞ্চল, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার ক্ষেত্রে নতুন সঞ্চালন লাইন প্রয়োজন হতে পারে। তবে এসব প্রকল্প ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং ঋণনির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জমি অধিগ্রহণ, যন্ত্রপাতি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের ঝুঁকি।
যে দেশে বিদ্যমান সঞ্চালন সক্ষমতার বড় অংশই পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না, সেখানে প্রতিটি সমস্যার সমাধান নতুন অবকাঠামো নয়। বরং আগে যাচাই করা প্রয়োজন, বর্তমান লাইন, উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করলে একই সমস্যার কতটা সমাধান সম্ভব। যেমন যানজট কমাতে সব সময় নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয় না; ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করেও সুফল পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।
এখানেই আসে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট গ্রিড পরিচালনার ধারণা। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু টাওয়ার, তার ও ট্রান্সফরমারের সমন্বয় নয়; এটি তথ্য বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত পরিচালনা কৌশলের সমন্বিত কাঠামো। উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে কোন লাইনে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে, কোথায় বিদ্যুৎ সরিয়ে দিলে সঞ্চালন আরও নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে, তা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব। এটি অনেকটা যানজট এড়িয়ে বিকল্প পথ দেখানো ডিজিটাল মানচিত্রের মতো কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া উন্নত বিশ্লেষণভিত্তিক পরিচালনা ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, কোন লাইনে কত বিদ্যুৎ যাবে, কোথায় ভোল্টেজ সমস্যা হতে পারে এবং পুরো ব্যবস্থার খরচ কীভাবে কমানো সম্ভব—এসব বিষয় একসঙ্গে মূল্যায়ন করা যায়।
বাংলাদেশের জন্য দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য একটি উদ্যোগ হতে পারে বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা আবহাওয়া ও বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী মূল্যায়ন করা। এতে নতুন লাইন নির্মাণের আগে বর্তমান অবকাঠামো থেকে অতিরিক্ত সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা জানা যাবে। তবে শুধু সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। অনেক ক্ষেত্রে ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ, সহায়ক শক্তির ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ প্রবাহ ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত পরিসরে প্রযুক্তিগত উন্নয়নও প্রয়োজন হতে পারে।
ঢাকার আশপাশের ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সঞ্চালন চাপ এবং ভোল্টেজজনিত সমস্যাগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে আরও দক্ষভাবে ব্যবহারের সুযোগ খুঁজে দেখা যেতে পারে।
এরপর ধাপে ধাপে উন্নত পরিচালনা ব্যবস্থা, বাস্তবভিত্তিক সক্ষমতা মূল্যায়ন, ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে নতুন সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ছাড়াই কতটা অতিরিক্ত সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব, তা যাচাই করা যাবে। বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় এমন উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; বরং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠারও একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হয় না। কোন এলাকায় কখন চাহিদা বাড়ছে, সেটিও পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবহার সাময়িকভাবে অন্য সময়ে স্থানান্তর করা গেলে গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তবে এটি জোরপূর্বক নয়, স্বেচ্ছাভিত্তিক ও প্রণোদনানির্ভর হতে হবে। যারা নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাবে, তাদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন স্মার্ট মিটার, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, স্বচ্ছ মূল্যনীতি এবং কার্যকর হিসাব নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এ ধরনের উদ্যোগ চালু হলে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ব্যয় কমবে, নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন কিছুটা পিছিয়ে যাবে এবং পুরো গ্রিড আরও স্থিতিশীল হবে।
বড় প্রকল্পের সঙ্গে বড় ব্যয়, বড় আমদানি এবং বড় আর্থিক স্বার্থ জড়িত থাকে। তাই তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান অনেক সময় গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে প্রতিটি প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, স্বাধীন পর্যালোচনা, বাস্তবায়নের পর কার্যকারিতা যাচাই এবং জনস্বার্থভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করে তোলাই হওয়া উচিত আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য।
- ড. মুহাম্মাদ তালুত: নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানিগবেষক

