অটোয়া কেবল তখনই আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে, যখন তা পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে থাকে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের প্রতি এবং ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে রাশিয়ার প্রতি কানাডার প্রতিক্রিয়ার মধ্যকার বৈপরীত্য সরকারের বিপজ্জনক দ্বৈত নীতিকে তুলে ধরে, যা বৈশ্বিক রীতিনীতির বৈধতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
উভয় সংঘাত বিষয়ে কানাডীয় সরকারের বিবৃতির আমাদের বিশ্লেষণে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর, কানাডা নৈতিক দৃঢ়তার সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এটিকে অবৈধ ও অযৌক্তিক বলে নিন্দা করেছিলেন। অটোয়া দ্রুত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই হাউস অফ কমন্স সর্বসম্মতিক্রমে ঘোষণা করে যে রাশিয়া গণহত্যা চালাচ্ছে ।
২০২৫ সাল নাগাদ কানাডা ইউক্রেনকে ২২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল , যার মধ্যে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার ছিল সামরিক সহায়তা । একই সাথে, দেশটি ৪৭,০০০-এরও বেশি ইউক্রেনীয় সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা করেন যে, ইউক্রেনের সংগ্রাম “ আমাদের সংগ্রাম ”।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়ে কানাডার প্রতিক্রিয়ার সাথে এর তুলনা করুন । শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অটোয়া দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর জোর দিয়ে আসছে ।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, গাজার বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এবং কমপক্ষে ৪০,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর কানাডা ইসরায়েলের নিন্দা করবে নাকি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, তখন ট্রুডো জোর দিয়ে বলেছিলেন : “ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে।”
প্রচণ্ড জনচাপের পরেই কানাডার সুরে পরিবর্তন আসে এবং কার্নি ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন । কিন্তু গত আগস্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ যখন স্বীকার করেন যে “গাজায় মানবিক দুর্ভোগ অকল্পনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে” এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে, তখনও কানাডা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করে।
প্রতিযোগী কাঠামো
কানাডা সুবিধাজনকভাবে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামোর মধ্যে দোদুল্যমান থাকে। রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে এটি উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাষা ব্যবহার করে, যা সার্বজনীন মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং ‘ সুরক্ষার দায়িত্ব’ (R2P)-এর মতো নীতি সমর্থনকারী একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা ।
কানাডা আর২পি (R2P) কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করেছিল, যা অনুযায়ী দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের জনগণকে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ থেকে রক্ষা করতে হবে; অন্যথায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ করার দায়িত্ব বর্তায়।
ইসরায়েলের মতো বন্ধুদের জন্য কানাডা নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থাকেই বেছে নেয় – এটি এমন একটি নমনীয় কাঠামো যা বৈশ্বিক রীতিনীতির প্রতি মৌখিক সমর্থন জানালেও, তা নিশ্চিত করে যে এই রীতিনীতিগুলো যেন পশ্চিমা মিত্রদের ওপর কখনোই প্রকৃত অর্থে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ না করে, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং দুর্বল অ-পশ্চিমা শাসনব্যবস্থাগুলোর বিরুদ্ধে সেগুলোকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করে।
নিয়ম -ভিত্তিক ব্যবস্থা হলো এমন একটি অভিযোজন যা সার্বজনীনতার বাহ্যিক রূপ বজায় রেখে পশ্চিমা আধিপত্যকে শক্তিশালী করে।
এই কাঠামোগত দ্বৈত নীতি একটি অস্বস্তিকর সত্যকে উন্মোচন করে যা খুব কম পশ্চিমা অভিজাতই স্বীকার করতে চান: গণহারে জোরপূর্বক সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার ওপর নির্মিত রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি তাদের সমর্থন এটাই প্রকাশ করে যে, কেবল কিছু জীবনের জন্যই শোক করা যায় এবং শুধুমাত্র ভূ-রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক জীবনগুলোর জন্যই লড়াই করা যুক্তিযুক্ত।
ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে ২৫০টিরও বেশি কানাডীয় সরকারি বিবৃতি ১০টি বাইনারি কোড ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করার পর আমরা একটি পদ্ধতিগত ধরন আবির্ভূত হতে দেখেছি।
ইউক্রেন প্রসঙ্গে কানাডা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছে, হাসপাতাল ও স্কুলে রাশিয়ার হামলার নিন্দা করেছে , ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করেছে, রাশিয়াকে স্পষ্টভাবে আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং আর২পি (R2P) নীতি প্রয়োগ করেছে।
২০২২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানি জোলি জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদকে বলেছিলেন : “মানবাধিকার সার্বজনীন এবং যুদ্ধ ও অপরাধকে ন্যায্যতা দিতে একে অপব্যবহার করা যায় না।”
কানাডার মধ্যম-শক্তির সক্রিয়তার পরিচয় দিয়ে তিনি আরও বলেন: “রুশ সরকার শান্তি ও আইনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে আমরা যে সনদটি গড়ে তুলেছি, তাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। রাশিয়া আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করতে এবং ‘জোর যার, ক্ষমতা তার’ এই নীতিতে বিশ্বকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আমরা এটা হতে দেব না।”
ক্ষতিগ্রস্ত নৈতিক অবস্থান
তবে গাজার বিষয়ে, কানাডা প্রাথমিকভাবে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে প্রতিরোধ করেছিল, ইসরায়েলি হামলাকে নির্বিচার বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে নিন্দা করা থেকে বিরত ছিল, ইসরায়েলের “অস্তিত্বের অধিকার”কে সমর্থন করলেও ফিলিস্তিনের জন্য সমতুল্য ভাষা পরিহার করেছিল এবং ইউক্রেনের জন্য যে R2P-এর পক্ষে ছিল, তা আনতে ব্যর্থ হয়েছিল।
২০২৪ সালের মার্চে তার ইসরায়েলি প্রতিপক্ষ ইসরায়েল কাটজের সাথে এক বৈঠকে জোলি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার বিরুদ্ধে কানাডার নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি সংহতি ও অটল প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন এবং আত্মরক্ষার জন্য ইসরায়েলের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেন। রাশিয়ার প্রতি তার অবস্থানের বিপরীতে, কানাডা ইসরায়েলকে কোনো গুরুতর জবাবদিহিতার আওতায় আনেনি, তবে এ কথা বলেছে যে ইসরায়েলকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করতে হবে।
কানাডা ইউক্রেনের ইতিহাসকে রুশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরে এবং হলোডোমোর দুর্ভিক্ষ , সোভিয়েত রুশীকরণ ও ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের ঘটনাকে উল্লেখ করে রাশিয়ার ২০২২ সালের আগ্রাসনকে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
তথাপি, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস আরও স্পষ্ট; ১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে শুরু করে, ১৯৬৭ সালের আগ্রাসী ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণ, গাজার ওপর কয়েক দশকব্যাপী অবরোধ এবং অধিকৃত অঞ্চলজুড়ে চলমান জাতিগত নির্মূল অভিযান পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেম এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ইসরায়েলের ব্যবস্থাটি বর্ণবৈষম্যেরই নামান্তর। নির্যাতন , ধর্ষণ , অনাহার এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ডের মতো ব্যাপক নৃশংসতার ঘটনা সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত আছে। কানাডা এই বাস্তবতাগুলো স্বীকার করতে নারাজ।
২০২৫ সালের অক্টোবরে, সিনেটর ইউয়েন পাউ উ প্রশ্ন করেন : “উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনের তুলনায় গাজার পরিস্থিতির প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়ায় দ্বৈত নীতি কেন রয়েছে?” তিনি সতর্ক করেন যে কানাডার পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা দেশটির নৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইউক্রেনের প্রতি কানাডার প্রতিক্রিয়া দেখায় যে, যখন কোনো আগ্রাসী রাষ্ট্র কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হয় এবং তাকে দুর্বল করাই লক্ষ্য থাকে, তখন পররাষ্ট্রনীতি কেমন হয়। গাজার প্রতি কানাডার প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের সমান্তরাল স্বার্থকেই মূর্ত করে তোলে।
কানাডা যে কোনো নৈতিক নীতি অনুসরণ করে তা সুবিধাবাদ বা কাকতালীয়তার কারণেই করে থাকে। যতক্ষণ না কানাডা বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে, তার নৈতিক দাবিগুলো অন্তঃসারশূন্য এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব দুর্বল থেকে যাবে।
- জেরেমি ওয়াইল্ডম্যান: এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন এবং
জোসেফ বুশার্ড: কুইবেকের একজন সাংবাদিক ও গবেষক। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

