বাংলাদেশে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চায়ের চাষাবাদ হলেও নিলাম বাজারের বিস্তার এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নিলাম কেন্দ্রের বাইরে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে নতুন দুটি কেন্দ্র চালু হলেও সেগুলো এখনো চা ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশের চা বিপণনের বড় অংশ এখনো এককভাবে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া মোট চায়ের প্রায় ৯৭ শতাংশই চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রের মাধ্যমে লেনদেন হয়। বাকি প্রায় ৩ শতাংশ বিক্রি হয় শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে। যদিও দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের চা উৎপাদিত হয় সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে, তবুও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বড় ক্রেতা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ঘাটতিতে নতুন দুটি কেন্দ্র কার্যত পিছিয়ে রয়েছে।
দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়। পরে দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০১৮ সালের ১৪ মে শ্রীমঙ্গলে দ্বিতীয় নিলাম কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় এবং প্রথম অনলাইনভিত্তিক চা নিলাম কেন্দ্র চালু করে সরকার। উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন এলাকার কাছেই বাজার গড়ে তুলে চা বিক্রির সময় ও ব্যয় কমানো। তবে সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
চা বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্রে মোট ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৪ লাখ ৩০ হাজার কেজি, যা মোট বিক্রির ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বিপরীতে এককভাবে চট্টগ্রামেই বিক্রি হয়েছে ৮ কোটি ৫৩ লাখ কেজি চা।
পরবর্তী ২০২৫-২৬ নিলামবর্ষেও একই চিত্র দেখা যায়। ওই সময়ে মোট ৯ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা বিক্রির মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৯ লাখ ৪০ হাজার কেজি বা ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বাকি ৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে।
চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমেও নতুন দুটি নিলাম কেন্দ্রের কার্যক্রমে তেমন গতি দেখা যাচ্ছে না। তিনটি কেন্দ্রের সর্বশেষ পাঁচটি নিলাম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পাঁচটি নিলামে ১ কোটি ১৬ লাখ ৭ হাজার কেজি চা গড়ে প্রতি কেজি ২৬৯ টাকা ১৪ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে।
অন্যদিকে ২০ মে থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের পাঁচটি নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৮৯ হাজার কেজি চা। সেখানে গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৫২ টাকা ৫ পয়সা। একইভাবে ২৮ এপ্রিল থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত পঞ্চগড়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি নিলামে ১ লাখ ৩৭ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৩৭ টাকা ৫৯ পয়সা।
২৯ জুন পর্যন্ত চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে নয়টি নিলামে মোট ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩২৮ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজির গড় মূল্য ছিল ২৭২ টাকা ১০ পয়সা। একই সময়ে শ্রীমঙ্গলে আটটি নিলামে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৫ কেজি চা গড়ে ২৫৩ টাকা ৯১ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। আর পঞ্চগড়ে পাঁচটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৫ কেজি চা, যেখানে গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৩৪ টাকা ৯৩ পয়সা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি নিলাম কেন্দ্রের মধ্যে চট্টগ্রামেই চায়ের দাম সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এরপর রয়েছে শ্রীমঙ্গল এবং সবচেয়ে কম দাম মিলছে পঞ্চগড়ে। এ কারণে অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক বেশি দামের আশায় চা চট্টগ্রামেই পাঠাতে আগ্রহী।
চা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন এলাকা হলেও শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে এখনো পর্যাপ্ত গুদাম, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেনের সুবিধা গড়ে ওঠেনি। পাশাপাশি দেশের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায় নতুন নিলাম কেন্দ্রে নিয়মিত অংশগ্রহণে আগ্রহ কম।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন বলেন, স্থানীয় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিত্তিতেই সরকার শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে নিলাম কেন্দ্র চালু করেছে। তবে এসব কেন্দ্র পরিচালনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বেসরকারি উদ্যোক্তাদের। তাঁর মতে, ধারাবাহিকভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত চা সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সময়ের সঙ্গে নতুন নিলাম কেন্দ্রগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তবে এখন পর্যন্ত সেখানে মোট বিক্রির অংশ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকাকে তিনি হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার কেজি বা ৪৭ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে মৌলভীবাজারে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পঞ্চগড়ে উৎপাদন হয়েছে মোট উৎপাদনের ২১ শতাংশ। এছাড়া হবিগঞ্জে ১৬ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১১ শতাংশ এবং সিলেট জেলায় ৪ শতাংশ চা উৎপাদিত হয়েছে।
বর্তমানে শ্রীমঙ্গলের নিলাম বাজার পরিচালনা করছে টি প্ল্যান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। পঞ্চগড়ে দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যান্ড টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন। আর প্রায় আট দশকের পুরোনো টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ পরিচালনা করছে চট্টগ্রামের নিলাম কেন্দ্র।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের টি সেলস কো-অর্ডিনেশন কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি এপ্রিল-মার্চ মৌসুমে চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলে ৪৭টি করে এবং পঞ্চগড়ে ২৫টি নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চট্টগ্রামে প্রতি সোমবার, শ্রীমঙ্গলে বুধবার এবং পঞ্চগড়ে মাসে দুইবার মঙ্গলবার নিলাম আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যান্ড টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবিএম আখতারুজ্জামান বলেন, পঞ্চগড় বর্তমানে দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল চা উৎপাদন এলাকা। গত দেড় থেকে দুই দশকে এ অঞ্চলের উৎপাদন দেশের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, সরকারি নীতিসহায়তা এবং অনলাইনভিত্তিক নিলাম ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে পঞ্চগড়ের নিলাম কেন্দ্রও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হতে পারে।

