মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, কাঁচামাল সরবরাহে বাধা এবং দেশের ভেতরে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এ খাতে আনুমানিক ১৫ হাজার কোটি টাকার বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারীরা বলছেন, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াই করছে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্লাস্টিক বাজারের আকার প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই দখলে রয়েছে প্যাকেজিং খাতের।
সংগঠনটির সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক শিল্পের গড় বিক্রি ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে বিক্রি কমার হার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নেমেছে। সব মিলিয়ে খাতটি প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বিক্রয় ক্ষতির মুখে পড়েছে।
উৎপাদন বন্ধ ৩০০ কারখানায়:
শিল্প মালিকদের সংগঠনটির হিসাবে, কাঁচামাল সংকট, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব এবং অর্থ সংকটের কারণে প্রায় ৩০০ প্লাস্টিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এর বেশিরভাগই ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও উৎপাদন খাতের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি এখনও পূরণ হয়নি।
কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক বা রিসাইকেল কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বর্তমানে মোট কাঁচামালের প্রায় ৩৮ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত উপাদান থেকে আসছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প মূলত পলিপ্রোপিলিন, পলিথিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পিইটি রেজিনের মতো কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এসব কাঁচামালের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমান থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কিংবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সমস্যা তৈরি হলে সরাসরি প্রভাব পড়ে কাঁচামাল সরবরাহে। এতে পরিবহন খরচ, বিমা ব্যয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
ন্যাশনাল পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রেজিনের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আমদানিতে নির্ধারিত শুল্কমূল্যও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি জানান, বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে উৎপাদনকারীরা পণ্যের দাম ৭ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি থাকায় এর চেয়ে বেশি দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, আগে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পর কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছাতে ১৮ থেকে ২১ দিন সময় লাগত। বর্তমানে একই প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে অন্তত ছয় সপ্তাহ। অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় প্রয়োজন হচ্ছে। কাঁচামালের সংকট ও জ্বালানি সমস্যার কারণে অধিকাংশ কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে বলে জানান রিয়াদ মাহমুদ।
বিপিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগে ২৫ কেজি পিইটি রেজিনের দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ৭৩ শতাংশের বেশি। তবে উৎপাদনকারীরা পণ্যের দাম বাড়াতে পেরেছেন মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান দিয়েও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক কারখানায় উৎপাদন ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিশেষ করে ইনজেকশন মোল্ডিং, ব্লো মোল্ডিং ও এক্সট্রুশনভিত্তিক পণ্য উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
চাহিদার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে নির্মাণসংশ্লিষ্ট প্লাস্টিক পণ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রীতে। তবে খাদ্য, ওষুধ, কৃষি এবং রপ্তানিমুখী প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
শিল্প মালিকরা মনে করছেন, বর্তমান সংকট বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এনেছে। তাদের দাবি, বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির ব্যবস্থা, রিসাইকেল কাঁচামালের ব্যবহার সম্প্রসারণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতিগত সহায়তা বাড়ানো গেলে এ শিল্প আবার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে ফিরতে পারবে।
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

