বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি খসড়া কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চাভিলাষী এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, তদারকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগত সংশোধনের সক্ষমতার ওপর।
বিদ্যুৎ বিভাগের খসড়া কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট সক্ষমতা ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এ সক্ষমতা দুই হাজার মেগাওয়াটেরও কম এবং বাস্তবে উৎপাদন অনেক সময় এক হাজার মেগাওয়াটের নিচে থাকে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই দিনের বেলায় মোট ১৫ হাজার ২১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে সৌর, জল ও বায়ু মিলিয়ে নবায়নযোগ্য উৎসের অবদান ছিল প্রায় ৮৫৩ মেগাওয়াট। তবে সন্ধ্যার চাহিদার সময় সৌরবিদ্যুৎ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ১২৮ মেগাওয়াটে।
সবচেয়ে বড় আশা রুফটপ সোলার: খসড়া কৌশলপত্রে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে ধরা হয়েছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- রুফটপ সোলার থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট
- ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট
- বায়ু, বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি-সৌর প্রকল্পসহ অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ভবন, গ্যারেজ, সেতু এবং উপযুক্ত অবকাঠামোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষিজমির ব্যবহার সীমিত রাখা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণের বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, সৌরচালিত সেচ পাম্প এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামোকেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে।
খসড়া কৌশলপত্রে অতীতের সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময় নীতিমালা, সৌর কর্মসূচি ও মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, সহায়ক নীতির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের দুর্বলতার কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি সম্ভব হয়নি।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মূল ভরসা এখনো সৌর:
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ৮০৬ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৫১৩ দশমিক ৭১ মেগাওয়াট, যা মোট নবায়নযোগ্য সক্ষমতার প্রায় ৮৪ শতাংশ।
এ ছাড়া জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট, বায়ু থেকে ৬২ মেগাওয়াট এবং বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে খুবই সামান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার বড় অংশ এখনো গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।
স্রেডার নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের সদস্য আশরাফুল আলম জানিয়েছেন, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি ব্যয় কমাতে সরকার কর ছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে। আমদানি পর্যায়ে কর ২ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে প্রকল্প ব্যয় কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৌশলপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর অর্থায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণ করে পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। শিল্পকারখানার বড় ছাদগুলোকে রুফটপ সোলারের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
খসড়া কৌশলপত্রে অনুমোদন নিয়ে সৌর প্যানেল স্থাপন না করা কিংবা স্থাপন করেও চালু না রাখার ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২০২৮ সাল থেকে এমন প্রকল্পের বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান কার্যকর করার চিন্তাও রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ, দায় নির্ধারণ, যাচাই প্রক্রিয়া এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
সরকার মনে করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হলে বিদ্যমান গ্রিডকে আরও আধুনিক ও স্থিতিশীল করতে হবে। এ কারণে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হবে। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে কিছু পরিস্থিতিতে এটি বাধ্যতামূলকও করা হতে পারে। পাশাপাশি নেট মিটারিং সহজ করা, ট্যারিফ কাঠামো সংস্কার এবং একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, নতুন কৌশলপত্রে ইতিবাচক অনেক দিক রয়েছে। কর ছাড়, রুফটপ সোলারে উৎসাহ, বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে একই কাঠামোয় বিবেচনা করা সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। কার্যকর পরিকল্পনা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বিদ্যুৎ খাত আরও টেকসই হবে।
খসড়া কৌশলপত্রে ২০২৬ ও ২০২৭ সালকে প্রস্তুতির সময় হিসেবে ধরা হয়েছে। এই সময়ে জমি নির্বাচন, দরপত্র, অর্থায়ন, গ্রিড সমীক্ষা, নেট মিটারিং সহজীকরণ এবং বিনিয়োগ প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে প্রকৃত বাস্তবায়নের বড় চাপ পড়বে ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি সময়মতো সম্পন্ন না হলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে কৌশলপত্রেই উল্লেখ করা হয়েছে।

