দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংকট এখন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য শিল্প খাতের বর্তমান বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এর ফলে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অন্যান্য উৎপাদন ও সেবা খাতের হিসাব যুক্ত করলে কর্মহীন মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান কর্মীরাও যদি ধারাবাহিকভাবে চাকরি হারাতে থাকেন, তাহলে কর্মসংস্থানের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে, নতুন শ্রম আইনের আওতায় ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার পর কিছু শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অভিযোগটি সত্য হলে তা শ্রম অধিকার ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
শুধু সংগঠিত শিল্প খাত নয়, দেশের অসংগঠিত খাতের অবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় কর্মশক্তি এই খাতেই নিয়োজিত। সেবা খাতেও বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। গত অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ভালো হলেও সারা বছর পর্যাপ্ত আয় নিশ্চিত করতে পারেননি অনেক কৃষিনির্ভর মানুষ। ফলে গ্রামীণ এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের চাহিদা বেড়েছে এবং শহরমুখী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় শিল্প খাতে স্থায়ী ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত।
শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু শ্রমবাজারের চাপ নয়, উৎপাদন সংকটও বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কোনো উদ্যোক্তাই ইচ্ছাকৃতভাবে কারখানা বন্ধ করতে চান না কিংবা সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন চালিয়ে যেতে আগ্রহী নন। কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা বর্তমানে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে বলে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্যও উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং নতুন করে বহু শ্রমিক কর্মহীন হতে পারেন।
চাকরি হারানো শ্রমিকদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে তারা বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনাও সময়মতো পাচ্ছেন না। শ্রম আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ যেমন কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রয়েছে, তেমনি সফল উদ্যোক্তারাও একই ধরনের অবকাঠামোগত সংকটে ভুগছেন। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ তাদের জন্য অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস সংকট অবশ্য নতুন নয়। অতীতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সময় শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পরে শিল্পের নতুন সংযোগের ক্ষেত্রেও গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হয় এবং সরবরাহ বৃদ্ধির আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ। বর্তমান গ্যাস সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়ছে, কারণ দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক।
দেশের গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়ে। এর ফলে একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহারও বাড়াতে হয়েছে। তবুও বিদ্যুতের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে লোডশেডিংও বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু বড় শিল্পাঞ্চলেই নয়, পল্লী বিদ্যুতের আওতায় পরিচালিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগেও পড়ছে। অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন চালিয়ে রাখতে গ্যাস বা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। একই সময়ে দেশে ডিজেলের দামও বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পের ব্যয়চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কিছুটা কমলেও স্পট মার্কেট থেকে বেশি পরিমাণে গ্যাস কিনতে হলে ব্যয় কমার সুযোগ সীমিত থাকে। উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান উচ্চমূল্য বহাল থাকলেও অন্তত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দাবি, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সময়মতো গ্যাস সংযোগ দেওয়া না হলে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও দুর্বল হবে।
ইতোমধ্যে সরকারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে বিনিয়োগ করেও দীর্ঘদিন গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী। এতে তাদের উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি, ব্যাংক ঋণও খেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যাংক খাতেও। এমন একটি জটিল পরিস্থিতির সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংককেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প খাতকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করাতে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিল্প খাতের আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ ঋণের উচ্চ সুদের হার। যদিও বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সুদের হার দ্রুত কমানো সম্ভব নয়—এ বাস্তবতা তারা স্বীকার করেন। তবে তাদের মূল আপত্তি ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বা ‘স্প্রেড’ নিয়ে। এই ব্যবধান কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কিছুটা কমলেও ঋণগ্রহীতারা তুলনামূলক স্বস্তি পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে সরকার স্বল্পসুদে চলতি মূলধন সরবরাহের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হলেও শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট—গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ—অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি সংকটের সমাধান না হলে নতুন অর্থায়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। কিছু অঞ্চলে গ্যাসের ঘাটতি এতটাই তীব্র যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কারখানা অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবতে হয়েছে, যা ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া।
বর্তমানে বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতি নতুন নয়; প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মাঝেমধ্যেই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পকারখানাগুলো নির্ধারিত চাপ অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ার সমস্যায় ভুগছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে, ক্রয়াদেশ কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ এবং সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারা—সব মিলিয়ে শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা শক্তি দুর্বল হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতি কিছু ক্ষেত্রে নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে সামাল দেওয়া গেলেও গ্যাসের বিকল্প সহজে তৈরি করা সম্ভব নয়।
সরকার স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের উদ্যোগ জোরদার করার কথা জানিয়েছে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও সীমিত। এদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, ফলে আপাতত আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও লাভজনক চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। অনেকের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান আরও আগে জোরদার করা গেলে বর্তমান চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো। গ্যাসের অভাবে সার কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। একই সময়ে ভোলায় নতুন গ্যাসের সন্ধান মিললেও তা বিদ্যমান শিল্পাঞ্চলে সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে সেখানে স্থানীয়ভাবে গ্যাসভিত্তিক শিল্প স্থাপনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন বিনিয়োগ, ব্যাংকিং এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে যাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে ঋণদাতা ব্যাংকের ওপর, আর শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন আমানতকারীরাও। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
সরকার একদিকে ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব করনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার আশ্বাস দিচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ তখনই কার্যকর হবে, যখন শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন।

