পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশে বৈদ্যুতিক (ইভি) ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করছে সরকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এসব যানবাহনের আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য একটি সমন্বিত খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সম্ভাব্য নীতিমালার কাঠামো, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় এবং বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইসিটি, ইনোভেশন ও পিআরজিআইএম) এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী জানান, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সরকার নীতিগত প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রথম ধাপে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হবে। আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৈঠকে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি এসব বাধা দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত প্রণোদনাগুলো কীভাবে দ্রুত কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হবে।
গাড়ি আমদানিকারক ও পরিবেশকদের মতে, বিকল্প জ্বালানিচালিত গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তাদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারে বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা, কর-সুবিধা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি এবং দেশব্যাপী চার্জিং অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে এই খাতের প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাত হবে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক সভাপতি মো. হাবিবউল্লাহ ডনের মতে, পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহন থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ দেশ এই ধরনের যানবাহনের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য শুল্ক ও কর-সুবিধা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেবে। তার মতে, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন শুরু হয়। এরপর থেকে টেসলা ও পোর্শেসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রায় ২০টি বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বর্তমানে দেশে আমদানি হওয়া যাত্রীবাহী গাড়ির প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই প্লাগ-ইন হাইব্রিড অথবা হাইব্রিড প্রযুক্তির।
বৈদ্যুতিক যানবাহন এমন প্রযুক্তিনির্ভর যান, যা পেট্রোল বা ডিজেলের পরিবর্তে ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে মোটরের মাধ্যমে চলে। পরিবেশ দূষণ কমানো এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসে এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির আমদানি নিরুৎসাহিত করতে চলতি বাজেটে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ সিসি ক্ষমতার কিছু গাড়ির ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্তারে সবচেয়ে বড় বাধা পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের অভাব। এছাড়া উচ্চ মূল্য, পর্যাপ্ত বাস ডিপোর সংকট, ব্যাটারির নিরাপত্তা ও পুনর্ব্যবহার-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাও এই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সরকার বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় কর-সহায়তা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি এবং চার্জিং স্টেশন-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশব্যাপী চার্জিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রপাতি আমদানির মোট করভার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য করহার সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
এছাড়া ইভি চার্জারের আমদানি শুল্ক ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর কমানো হয়েছে। ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ির জন্য অটো ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ৮০ লাখ টাকা করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সংযোজিত বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদও ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্কুলার অনুযায়ী, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করতে অটো লোনের নতুন সুবিধা চালু হয়েছে। এর আওতায় বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি কেনার জন্য গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টদের আশা, নীতিগত সহায়তা, কর-প্রণোদনা, সহজ অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

