বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে দেশীয় নানা সংকটের মধ্যে কঠিন সময় পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ—সব মিলিয়ে উৎপাদন ও রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি বছরে গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ৬৪৫ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার বা ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগামী কয়েক বছরে গড়ে বছরে প্রায় ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতিতে এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
দুই বছরে বন্ধ প্রায় পাঁচ শতাধিক কারখানা:
শিল্পপুলিশ ও পোশাক খাতের বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা রয়েছে। একই সময়ে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিল্পপুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি ছিল বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের এবং ২৮৭টি অন্যান্য শিল্পের। বন্ধ হওয়া পোশাক কারখানার মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি, বিকেএমইএর ৩৫টি, বিটিএমএর ৮টি এবং বেপজার আওতাধীন ১৯টি কারখানা রয়েছে।
তবে বিজিএমইএর নিজস্ব তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। সংগঠনটির হিসাবে, গত দুই বছরে তাদের সদস্যভুক্ত ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই বন্ধ হয়েছে ১৪১টি এবং ২০২৪ সালে বন্ধ হয়েছিল ৭৭টি কারখানা। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা রয়েছে ২ হাজার ১২৭টি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হওয়াও ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্য নির্ধারণের সময় পোশাক খাতে যে প্রবৃদ্ধি ছিল, পরে তা আর বজায় থাকেনি। করোনা মহামারির সময় আন্তর্জাতিক অনেক ব্র্যান্ড বাংলাদেশে এলেও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়নি।
তার মতে, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে উদ্যোক্তাদের প্রধান লড়াই টিকে থাকা। বর্তমান সরকার কিছু উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর সুফল পেতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে।
বিশ্ববাজারে বর্তমানে ম্যান-মেইড ফাইবার (এমএমএফ) দিয়ে তৈরি উচ্চমূল্যের পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন এমএমএফভিত্তিক পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানিতে এমএমএফ পোশাকের অংশ মাত্র ২৯ শতাংশ। বাকি ৭১ শতাংশই তুলাভিত্তিক পণ্য।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এমএমএফের কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের বিকাশে বাধা হয়ে ছিল। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিনথেটিক ফেব্রিকসের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার এবং কিছু কাঁচামালে শুল্ক ছাড় দেওয়ায় ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শিল্প এখনো বড় পরিসরের কমমূল্যের বেসিক পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। অথচ ছোট পরিসরের ফ্যাশননির্ভর ও উচ্চমূল্যের পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে লিড টাইমও বেশি থাকছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বড় চ্যালেঞ্জ।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি অংশের আস্থার সংকটে রয়েছে। এর ফলে কয়েকটি বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। তার মতে, নীতিগত সংস্কার, নতুন বিনিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো গেলে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তিনি আরও জানান, সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের ধরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক বিক্রয় ও সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি, আন্তর্জাতিক বিপণন জোরদার এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হলেও, সঠিক নীতি সহায়তা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারলে সময়ের ব্যবধানে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে।

